খুলনা ব্যুরো ॥ রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঞ্চালন লাইনে কর্মরত শ্রমিকরা বকেয়া পাওনার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে স্থানীয় ’শ ’শ শ্রমিক ও সাপ্লাইয়ার ওই প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধন পালন করেন।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার মল্লিকের মোড়ে মানববন্ধনে বক্তারা বকেয়া টাকা না পেলে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করতে দিবেন না বলে জানান। বটিয়াঘাটা কচুবুনিয়ার রিভার ক্রসিং টাওয়ারের চলমান কাজ স্থানীয় শ্রমিকরা মজুরির বকেয়া টাকা না পেয়ে বন্ধ করে দেন। রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রথম মেগা প্রকল্প। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে।
মানববন্ধনে শ্রমিকরা জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহের সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভারতীয় কোম্পানি ইএমসি’র কাছে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা। এ টাকা না পাওয়ার কারণে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছেন না স্থানীয় ঠিকাদাররা। নির্মাণ কাজ শেষ না করেই বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে ভারতীয় ওই কোম্পানি। ব্যাংকে জমা থাকা পারফরমেন্স গ্যারান্টির টাকাও তুলে নিয়েছেন তারা। এ কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ দুই বছরেরও বেশি সময় পিছিয়ে গেছে। তাছাড়া দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ভারতীয় ওই কোম্পানির কাছ থেকে কাজ নিয়ে বাংলাদেশের যে ঠিকাদাররা কাজ করছিলেন তারাও পথে বসেছেন। দেশীয় ছোট ছোট ৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকাও দেয়নি ভারতীয় ওই কোম্পানিটি।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)ও প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকার যে কয়টি লাইন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে একটি খুলনা-মোংলা ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট ট্রান্সমিশন লাইন। ভারতীয় কোম্পানি ইএমসি ও চীনা কোম্পানির টিবিইএ’র যৌথ উদ্যোগকে (জেভি) কাজের জন্য নির্বাচিত করে সরকারি সংস্থা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। এ জন্য ইএমসি-টিবিইএ’র সাথে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং মার্কিন মুদ্রায় ৮৫লাখ ১৬হাজার মার্কিন ডলার দেওয়ার চুক্তি করে পিজিসিবি। চুক্তির আওতায় সঞ্চালন লাইনটির মালপত্র সরবরাহ, প্রয়োজনীয় খনন ও পরীক্ষণ এবং বাস্তবায়নের কাজ করার কথা ভারতীয় কোম্পানি ইএমসি ও চীনা কোম্পানি টিবিইএ’র।
সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পিজিসিবি ও ইএমসি-টিবিইএর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী পরবর্তী ১৮ মাস অর্থাৎ ২০১৭ সালের জুনে সঞ্চালন লাইনটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা। কেন্দ্র থেকে খুলনার হরিনটানা সাবস্টেশন পর্যন্ত লাইনটির দৈর্ঘ্য ২৪ কিলোমিটার। দুই দফা সময়সীমা বাড়িয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ না করে ওই বছরের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায় নির্মাণ কাজের নেতৃত্বে থাকা ইএমসি। পিজিসিবিকে না জানিয়ে ইএমসি তাদের ঢাকা ও খুলনা অফিস বন্ধ করে দেয় এবং তাদের সব কর্মকর্তা প্রতিনিধি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকে নির্মাণাধীন প্রকল্পটির কাজ।
সূত্রে আরও জানা গেছে, ১৮ মাসের কাজ দুই দফা সময়সীমা বাড়িয়ে ৩৬ মাস পর্যন্ত সময় নেয় ইএমসি-টিবিইএ। এই যৌথ উদ্যোগের নেতৃত্ব দেয় ইএমসি। কাজ এগোচ্ছিল না বলে কয়েক দফা তাদের তাগাদা দেয় পিজিসিবি। কিন্তু কাজ কাঙ্খিত গতিতে সম্পন্ন হয়নি। নিজেদের পাওনা পিজিসিবির কাছ থেকে বুঝে নিলেও স্থানীয় সরবরাহকারী-ঠিকাদারদের পুরো পাওনা বুঝিয়ে দেয়নি ভারতীয় ওই প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে প্রকল্প শুরুর দিকে পারফরমেন্স গ্যারান্টি এবং ইএআর ইনসিওরেন্স হিসেবে ব্যাংকে জমা দেওয়া চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ (৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং ৮ লাখ ৫১ হাজার মার্কিন ডলার) পরিমান টাকাও তারা তুলে নিয়ে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ইএমসি’র সাড়া না পেয়ে ২০১৮ সালের ২০ ডিসেম্বর তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি চীনা প্রতিষ্ঠান কোম্পানি টিবিইএ কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ সরকারের কোম্পানি পিজিসিবি। ওই চিঠিতে পিজিসিবি বলে, প্রকল্পের পারফরমেন্স গ্যারান্টি (পিজি) এবং ইএআর (ইরেকশন অল রিস্কস) ইনসিওরেন্সের মেয়াদ যথাক্রমে গত ২৬ আগস্ট ও ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়ে গেছে। এই পিজি ও ইএআর ইনসিওরেন্সের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য ইএমসিকে দু’বার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইএমসি তাতে সাড়া দেয়নি। প্রকল্প এলাকায়ও কোনো কাজ হচ্ছে না। পুরো কাজের ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২৫ শতাংশ বাকি। ওই সময় পর্যন্ত ৯০ শতাংশ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত সব পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। চিঠিতে আরো বলা হয়, এটি পরিষ্কার যে ইএমসি লিমিটেড ইন্ডিয়া প্রকল্প কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি হিসেবে বাকি কাজ সম্পন্ন করে কাজটি সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া ইএমসি’র জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি চীনা কোম্পানি টিবিইএর দায়িত্ব।
পিজিসিবি’র ওই চিঠির পর কেটে যায় প্রায় এক বছর। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের আরো দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পায় টিবিইএ। খুলনা-মোংলা ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট ট্রান্সমিশন লাইনের বাকি কাজ শেষ না করলে টিবিইএকে কালো তালিকাভুক্ত করা এবং দেশের অন্য কাজগুলোও বাতিলের বার্তা দেয় পিজিসিবি। ওই বার্তার পর এই বাকি কাজ করে দিতে রাজি হয় চীনা কোম্পানি টিবিইএ। পরে ২০১৯ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে তারা প্রকল্পের অসম্পন্ন কাজ শেষ করতে কাজ শুরু করে। এ জন্য নতুন করে ঠিকাদারদের সাথে চুক্তিও করে। কিন্তু আগের দেশীয় ঠিকাদারদের পাওনা এখনো মেটায়নি। এর ফলে দেশীয় উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ভারতীয় যে কোম্পানি ইএমসির কারণে এই দেরি হলো তার বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৯ সালের মধ্যে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসার কথা ছিল। সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ উৎপাদন শুরু করার কথা।
এদিকে দেশীয় ঠিকাদাররা আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে অবগত করেও কোন প্রকার সুরাহা পাননি। বরং আর্থিক ক্ষতির শিকার একজন ঠিকাদার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী রয়েছেন। অপর প্রতিষ্ঠান শিকাদার এন্টারপ্রাইজও ধার দেনার কারণে অসহ্য যন্ত্রনার মধ্যে রয়েছেন। এ নিয়ে তারা পালিয়ে যাওয়া ভারতীয় কোম্পানি ইএমসি’র জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান চীনা কোম্পানি টিবিইএ’র কাছে ধর্ণা দিয়েও কোন সুরাহা পাননি। তবে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র আড়াই কোটি প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান টিবিইএ। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত দেশীয় ঠিকাদাররা তাদের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানা গেছে।




