জননেতা তরিকুল ইসলামের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সুন্দর সাহা ॥ যশোর তথা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের শোক ও শূণ্যতার দিন আজ। জাতীয়তাবাদী চেতনার অকুতোভয় এই কাণ্ডারী আজকের দিনেই চলে যান না ফেরার দেশে। আজকের দিনটা সে কারণে জাতীয়তাবাদী চেতনার মানুষের কাছে কষ্টের দিন। প্রিয় মানুষকে হারানোর দিন। একজন রাজনীতিবিদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে তরিকুল ইসলাম ছিলেন গণমানুষের নেতা। জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অনেক গভীর। যশোর অঞ্চলসহ সারা দেশের বহু নেতাকর্মী ও মানুষকে তিনি বাইনেমে চিনতেন। খুব কম নেতা এ যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। রাজনৈতিক মানসিকতা, সামাজিকতা, জীবনাচারসহ সার্বিকভাবে তাকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে কর্মীরা পর্যন্ত একজন ইতিবাচক রাজনীতিক মনে করতেন।
বরেণ্য রাজনীতিক তরিকুল ইসলাম ১৯৪৬ সালের ১৬ই নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন যশোর শহরে। তার পিতা আলহাজ আবদুল আজিজ ছিলেন যশোর শহরের একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। মা মোসাম্মৎ নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। পারিবারিক পরিবেশে বাল্যশিক্ষার মাধ্যমে পড়ালেখায় হাতেখড়ি হয় তার। ১৯৫৩ সালে তিনি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন যশোর জিলা স্কুলে। ১৯৬১ সালে জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৯৬৩ সালে এমএম কলেজ থেকে আইএ, ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) ও ১৯৬৯ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালের কথা। তরিকুল ইসলাম তখন যশোর এমএম কলেজের শিক্ষার্থী। যশোর শহরের শহীদ মিনারটি ছিল ভাঙাচোরা। তরিকুল ইসলাম ও তার বন্ধু ও সহপাঠীরা একটি শহীদ মিনার তৈরি করেছিলেন। শহীদ মিনার তৈরির কারনে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক সরকারের রোষানলে পড়ে গ্রেপ্তার হন তরিকুল ইসলাম। কারাগারে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। কারাগারেই দীক্ষা নেন বাম রাজনীতির। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে যশোর এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। বৃহত্তর যশোর জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে সর্বেক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন এমএনএ আহম্মদ আলী সর্দারের দায়েরকৃত মিথ্যা মামলায় কিছুদিন কারাভোগ করেন এই ভাষা সৈনিক। ১৯৬৮ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্য রাজবন্দি হিসেবে তিনি যশোর ও রাজশাহীতে কারাভোগ করেন দীর্ঘ নয় মাস। ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় ফের গ্রেপ্তার হন বরেণ্য এই নেতা। পরে কমিউনিস্ট পার্টির নীতি-আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে না পেরে বেছে নেন নতুন পথ। ১৯৭০ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভাসানী আহূত ফারাক্কা লং মার্চেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কথা বলে যেমন কারাভোগ করেছেন, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী হিসেবেও তাকে যেতে হয়েছে জেলে। ভাসানী ন্যাপ থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন বরেণ্য এ রাজনীতিক। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট প্রথম আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য তরিকুল ইসলাম। সেই সঙ্গে বিএনপির যশোর জেলা আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে তিনি দলের যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, ভাইস চেয়ারম্যান ও ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটির সদস্য পদে পদোন্নতি পান। রাজনীতিতে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে তরিকুল ইসলামকে মাড়িয়ে আসতে হয়েছে কাঁটা বিছানো পথ। রাজনীতিতে দৃঢ়চেতা এ নেতা স্বৈরাচার এরশাদ আমলে গ্রেফতারের পর শিকার হন নিষ্ঠুর নির্যাতনের। তিনি কারাভোগের মাধ্যমে রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে মিথ্যা মামলা ও কারাভোগের শিকার হয়েছেন বারবার। যশোরে উদীচী হত্যা মামলা, অধুনালুপ্ত রানার পত্রিকার সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুল হত্যাকাণ্ডসহ নানা মামলায় আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে তার নাম। ওয়ান ইলেভেনের সময়ও গ্রেফতার হন তরিকুল ইসলাম। কারাভোগ করেন দীর্ঘ দেড় বছর। মহাজোট সরকারের আমলেও নতুন নতুন মামলার আসামি হয়ে গ্রেপ্তার ও কারাভোগ করেছেন। বিএনপিতে তার প্রভাব ও গুরুত্বের কারণে মামলা ও গ্রেপ্তারে বারবার টার্গেট হয়েছেন রাজনৈতিক প্রতিপরে।
১৯৭৩ সালে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তরিকুল ইসলাম নাম লেখান জনপ্রতিনিধির খাতায়। ১৯৭৮ সালে যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে যশোর সদর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত ও ১৯৮১ সালে সড়ক ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী চরিত্র হলেও ভোটের রাজনীতিতে তাঁর ছিল মিশ্র অভিজ্ঞতা। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। পরের বছর হন পূর্ণমন্ত্রী। ১৯৯৪ সালে দায়িত্ব পান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পর্যায়ক্রমে খাদ্য, তথ্য ও সর্বশেষ বন ও পরিবেশমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন। সবসময় তার জীবনযাত্রা ছিল খুবই সাধারণ। আঙুল ফুলে কলাগাছ হননি তিনি। আগাগোড়াই গণমানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত একজন নেতা। নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা যেমন, জাতীয় রাজনীতিতেও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। সার্বিকভাবে জনবান্ধব, সজ্জ্বন ও মার্জিত চরিত্রের একজন রাজনীতিক তিনি। প্রগতিশীল রাজনীতির ভেতর দিয়েই রাজনীতিক তরিকুল ইসলামের জন্ম ও উন্মেষ। তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের অত্যন্ত দক্ষ একজন সংগঠক ছিলেন। পরে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপের রাজনীতি করেছেন। বিএনপির জন্মলগ্ন থেকেই এ দলটির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলে তিনি। বিএনপির রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতন্ত্রের পক্ষের ও প্রগতিশীল চিন্তার একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। মা-মাটি-মানুষের সাথে তাঁর ছিল নিবিড় সম্পর্ক। উন্নয়নের মাইল ফলক সৃষ্টি করেন তিনি। যার কারনে যশোরের মানুষ তাঁকে আধুনিক যশোরের রূপকার, যশোর উন্নয়নের কারিগরের স্বীকৃতি দেন। পারিবারিক জীবনে তরিকুল ইসলাম ছিলেন দুই ছেলের পিতা। তার স্ত্রী অধ্যাপক নার্গিস বেগম যশোর সরকারি সিটি কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে অবসরে যান। নার্গিস বেগম অবসরে যাওয়ার পর তিনি দৈনিক লোকসমাজের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নার্গিস বেগম চারদশক ধরে বিএনপির রাজনীতিতে নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছিলেন। বর্তমানে জেলা বিএনপির নেতারা তাকে দিয়েছেন জেলা বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব। তরিকুল ইসলামের বড় ছেলে শান্তনু ইসলাম সুমিত ব্যবসা করেন। বর্তমানে লোকসমাজ পত্রিকার প্রকাশক। ছোট ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রাজনীতি করেন। ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত অমিত বর্তমানে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। আধুনিক যশোরের রূপকার জননেতা তরিকুল ইসলামের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচদিন ব্যাপী নানান কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।
প্রসঙ্গতঃ বার্ধক্যের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, কিডনি জটিলতা কাবু করে ফেলে তাঁর শরীর। তিনি আক্রান্ত হন ফুসফুসের ক্যানসারে। এমনিতর এক পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর এই দিনে সকলকে কাঁদিযে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। তিনি যে কতবড় মহীরূহ ছিলের তার প্রমান মেলে তাঁর মৃত্যুর পর। লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে তাঁর বাড়িসহ শহর জুড়ে। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ আছড়ে পড়ে যশোর ঈদগাহ ময়দানসহ শহর জুড়ে। শেষ জীবনে অসুস্থ্য শরীরে নীরবে-নিভৃতে দিন কাটানো বিএনপির অত্যন্ত প্রভাবশালী এ নেতা শেষ গন্তব্যে যাওয়ার সময়ও জানান দিয়ে গেলেন মাটি-মানুষের সাথে তাঁর সখ্যতার গভীরতা। যশোরের ইতিহাসে এতো বড় জানাজা কেউ কখনও দেখেননি। হয়তো দেখবেনও না আর কখনও। শোকাবহ সেই দিনে যশোর তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে আজ স্মরন করবেন শ্রদ্ধাবনত সেই শীরে।

ভাগ