খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ কাজে গতি নেই

খুলনা প্রতিনিধি॥ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও জমি অধিগ্রহণের ২৪ বছর পরও খুলনার খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণে গতি আসেনি। এমনকি জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকাও অনেকেই পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। রামপাল-মোংলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খুলনার সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ‘পিপিপিতে নয়, রাজস্ব খাতের নিজস্ব অর্থায়নে এই বিমানবন্দর নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।’ বিভাগীয় শহর খুলনায় বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়টি আলোচনায় আসে সেই ষাটের দশক থেকে। তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে খুলনার মূল শহর হতে ১৭ কিলোমিটার দূরে ফুলতলার মশিয়ালীতে বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়। ১৯৬৮ সালে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে খুলনা শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে বিল ডাকাতিয়ার তেলিগাতিতে স্থান নির্বাচন এবং জমি অধিগ্রহণও হয়। পরে সেই জমি বাতিল করে আশির দশকে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালিতে স্থান নির্ধারণ করা হয়। এরশাদ সরকারের আমলে তৎকালীন বিমানমন্ত্রী মরহুম কর্নেল এইচএম গাফফার খুলনা-মোংলা মহাসড়কের ওপর স্টল বিমান নামানোর ঘোষণা দেন। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে ৯৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বাগেরহাট জেলার রামপালে খানজাহান আলী বিমানবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে স্টলপোর্ট চালুর জন্য মাটি ভরাটসহ নানাবিধ কাজও সম্পন্ন হয়। পরে ২০১১ সালের ৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুলনায় খানজাহান আলী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর করার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর নতুন করে আরও ৫৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ৫৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প অনুযায়ী দেশি ও বিদেশি যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে সীমানা চিহ্নিতকরণে কাঁটা তারের বেড়া আর একটি সাইনবোর্ড ছাড়া কিছুই হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী প্রকৃত ক্ষতিপূরণ পাননি বলে দাবি করেন।
রামপাল উপজেলার হোগলডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মামুন মলঙ্গীর স্ত্রী মারিয়া বেগম (৩০) বলেন, ‘বসতবাড়ির জমিটুকু ছাড়া আমার আর কোনও জমি নেই। জমিটুকু বিমানবন্দরের জন্য সরকার নিয়ে নিয়েছে। টাকা যা পেয়েছি, তাতে নতুন করে জমি কিনতে পারছি না। নতুন জমির অনেক দাম। আবার বসতবাড়ি করার মতো জমিও কিনতে পাওয়া যায় না। নতুন বাড়িঘর তৈরি করে যেখানে যাবো, সেখানকার সবাই অপরিচিত। স্বজনদের ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হবে। নতুন শুরুর জন্য প্রয়োজন অনেক টাকা। কিন্তু সরকার আমাদের প্রয়োজনের দিকটা দেখছে না।’ হোগলডাঙ্গা গ্রামের প্রায় পরিবারেই এমন হাহাকার। খানজাহান আলী বিমানবন্দরের জন্য নতুনভাবে জমি অধিগ্রহণে এই গ্রামের প্রায় সব জমিই চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকা নেওয়ার জন্য অফিস আদেশ হয়েছে। জমি, অবকাঠামো ও অন্যান্য ফসলের জন্য ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছে। বিপত্তি হয়েছে এ কারণে যে, ক্ষতিপূরণের অর্থ সবার মাঝে সুষম বণ্টন হয়নি। কারও কারও অভিযোগ ভূমি অফিসের কর্তারা সুবিধা নিয়ে কাউকে কাউকে অনেক ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিয়েছে। আর যারা তাদের সন্তুষ্ট করেননি, তাদের জন্য ক্ষতিপূরণের অর্থ খুবই কম নির্ধারিত হয়েছে। একই গ্রামের মনসুর মল্লিক জানান, তিনি ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫ লাখ টাকা পেয়েছেন। এর জন্য অফিসে দিতে হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। মাহমুদ মৌলঙ্গীকে ক্ষতিপূরণের ২৪ হাজার টাকা পেতে দিতে হয়েছে ৫ হাজার টাকা। মাহমুদ মৌলঙ্গী বসতঘরের ক্ষতিপূরণ পাননি, পেয়েছেন মুরগির ঘর বাবদ ২৪ হাজার টাকা।
রামপাল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাধন কুমার বিশ্বাস জানান, খানজাহান আলী বিমানবন্দরের জমি অধিগ্রহণ করা ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা অনেকেই টাকা এখনও পাননি। তিনি জানান, বিমানবন্দর নির্মাণের আগ্রগতির ব‌্যাপারে তার কিছু জানা নেই। দৃশ্যমান বলতে সীমানা প্রাচীর দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সিভিল এভিয়েশন দেখছে। তারাই ভালো বলতে পারবে। স্থানীয়রা আমাকে জানিয়েছেন দীর্ঘদিনই বিমানবন্দরের নির্মাণ চিত্র একই।’ বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. লিয়াকত হোসেন খুলনা-মোংলা মহাসড়কের পাশের শিল্পায়নের বিষয়টি মাথায় রেখে দ্রুত বিমানবন্দরের কাজ শুরু এবং শেষ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘মোংলা বন্দর গতিশীল করতে বিমানবন্দর খুবই জরুরি।’ খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী সাবিরুল ইসলাম বলেন, ‘নওয়াপাড়া থেকে বাগেরহাটের মোংলা পর্যন্ত খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এলাকাভুক্ত। এ এলাকায় কোনও বিমানবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা আমাদের নেই।’
গত ১ অক্টোবর কেডিএ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত উন্নয়ন পর্যালোচনা বৈঠকে বিমানবন্দর প্রসঙ্গে জানানো হয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং বাংলাদেশ প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর নগর পরিকল্পনাবিদদের সুপারিশ রয়েছে খানজাহান আলী বিমানবন্দর স্টল বিমানবন্দর করা যাবে, কিন্তু বড় পরিসরে বিমানবন্দর তেমন লাভজনক হবে না। খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জড়িত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর এবং গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের সাবেক ডিন সিনিয়র শিক্ষক ড. রেজাউল করিম জানান, পদ্মা সেতু নির্মাণ সমাপ্ত হলে খানজাহান আলী বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে। একইভাবে সুন্দরবনের নিকটবর্তী হওয়ায় বিমানবন্দরের শব্দ জীবজন্তুর স্বাভাবিক কার্যাক্রম ব্যাহত করবে। এজন্য তারা বিমানবন্দর নির্মাণে নিরুৎসাহিত করছেন। তিনি সম্প্রতি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রণয়ন করা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা টিমের সদস্য ছিলেন।
তিনি জানান, কেডিএ’র পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে খানজাহান আলী বিমানবন্দর বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে না। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার ফয়লায় তৈরি পরকিল্পনায় ছিল খানজাহান আলী বিমানবন্দর। মূল প্রকল্পটি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৫ সালের মে মাসে একনেকে অনুমোদিত হয়। পরে ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ প্রকল্পটি পিপিপি’র আওতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে গ্রহণের জন্য নীতিগত অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। রামপাল মোংলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ‘দীর্ঘদিন প্রকল্পটি পিপিপিতে থাকায় কোনও অগ্রগতি নেই। তাই এবার রাজস্ব খাতে নিজস্ব অর্থায়নে বিমানবন্দর নির্মাণের সুপারিশ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘পিপিপিতে থাকায় বেসরকারিভাবে কেউ এগিয়ে না আসায় দীর্ঘদিনেও খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ কাজের অগ্রগতি নেই।’ তবে তিনি পিপিপি হতে বাদ দিয়ে এই প্রকল্প রাজস্ব খাতে এনে নির্মাণ করার সুপারিশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘মোংলা বন্দর এলাকায় যেভাবে দ্রুত শিল্পায়ন হচ্ছে, তাতে বিমানবন্দর জরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দর নির্মাণ কাজ ধীর গতিতে চলছে। ১৯৯৬ সালে স্টল বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য ৯৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পরে কাজ সম্প্রসারণ করতে আরও ৫৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। রাজস্ব খাতেই এবার দ্রুত বিমানবন্দরের কাজ বাস্তবায়ন হবে।’

ভাগ