বিচার বিভাগ পৃথক্ করণের ১৩ বছর : বেড়েই চলছে মামলা জট

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ আলাদা করার সময় দেশের সব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার। বর্তমানে সেই মামলার জট এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ লাখে এর মধ্যে অধস্তন আদালতেই বিচারাধীন মামলা প্রায় ৩৫ লাখ। বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচার বিভাগ পৃথক্ করণ-সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া ১২ দফা নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি। পৃথক সচিবালয় গঠন না হওয়াটাই স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। কারণ বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি, পদায়নের বিষয়গুলোতে আইন মন্ত্রণালয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে। মামলার সংখ্যা অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা কম। সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট উভয় বিভাগে মোট বিচারপতি রয়েছেন ১০২ জন। আর দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারকের সংখ্যা এক হাজার ৮০১ জন।
তবে আদালতের মূল বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে আছেন এক হাজার ৪০০ জনের মতো বিচারক। অবশিষ্ট বিচারকরা সুপ্রিম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয়, ট্রাইব্যুনাল, আইন কমিশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ডেপুটেশনে (পদায়ন) কর্মরত রয়েছেন। ফলে বিচারকদের সংকট মামলা জট নিরসনে ডেকে এনেছে বিপর্যয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিএমএম) গত ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৭২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলার সংখ্যা ১৫ হাজার ৫২১টি। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮০টি। সিএমএম আদালতের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাসে সিএমএম কোর্টে নতুন মামলা হিসেবে যোগ হয়েছে ১০ হাজার ৮৩২টি মামলা। পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলা রয়েছে ১৬ হাজার ৫৮টি। এ ছাড়া, জুলাই মাসে ৭ হাজার ২১৭, আগস্টে ৯ হাজার ১৪৯ এবং সেপ্টেম্বরে ১২ হাজার ৩৪টি মামলা বিচারের জন্য যোগ হয়েছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিএমএম) গত ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৭২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলার সংখ্যা ১৫ হাজার ৫২১টি। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮০টি। সিএমএম আদালতের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাসে সিএমএম কোর্টে নতুন মামলা হিসেবে যোগ হয়েছে ১০ হাজার ৮৩২টি মামলা। পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলা রয়েছে ১৬ হাজার ৫৮টি। এ ছাড়া, জুলাই মাসে ৭ হাজার ২১৭, আগস্টে ৯ হাজার ১৪৯ এবং সেপ্টেম্বরে ১২ হাজার ৩৪টি মামলা বিচারের জন্য যোগ হয়েছে।
এ ছাড়া, গত ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা জেলায় (মহানগরসহ) ৯৯৯৭৩টি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দ্রুত বিচার প্রাপ্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ঢাকা ছাড়াও, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটে একটি করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আছে। সুপ্রিম কোর্টের তথ্যানুসারে, নয়টি ট্রাইব্যুনালে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দুই হাজার ৯৩৫টি। এর মধ্যে গত পাঁচ বছর ধরে বিচারাধীন রয়েছে ২৮৮ মামলা এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আরো ৯৬ মামলা।
সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে ২০০৭ সালের ১লা নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয় বিচার বিভাগকে। এরপর থেকে শুরু হয় বিচার বিভাগের স্বাধীনভাবে পথচলা। গতকাল ১লা নভেম্বর ১৩ বছর পূর্ণ হলো। শুরুতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না থাকায় বিচারকদের এজলাস ভাগাভাগি করে কাজ করতে হতো। তবে, সময়ের ব্যবধানে সে অবস্থার অনেকটাই উত্তরণ করতে পেরেছে সরকারের বিচার বিভাগ। কিন্তু লাগামহীন হয়ে পড়েছে মামলা জট। বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের পর বছর পার হয়। কিন্তু তাদের মামলা শেষ হয় না। বিচার শেষ হওয়ার আগে অনেক আসামি মারাও যান। এক সময় তারা হতাশ হয়ে রায়ের আশা ছেড়ে দেন।
এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের সঙ্গে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, যে উদ্দেশ্যে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ করা হয়, সেই উদ্দেশ্য কিন্তু প্রতিফলিত হচ্ছে। বর্তমানে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তবে বিচারপ্রার্থীদের একটি প্রত্যাশা ছিল দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হবে। সেই চেষ্টাও কিন্তু চলছে। তবে আরো একটু উদ্যোগী হতে হবে। যেমন বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে যেসব মামলাগুলো অনেক পুরাতন, কয়েকটা শুনানি করা গেলে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, প্রথমে এসব মামলাগুলোর তালিকা করতে হবে। এরপর দ্রুততম সময়ে শুনানি করে নিষ্পত্তি করার উদ্যোগ নিলে মামলা জট অনেকাংশে কমে যাবে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার উদ্দেশ্য ছিল, প্রশাসন যেহেতু রাজনৈতিক চাপে থাকে, সেই চাপ থেকে যেন বিচার বিভাগ মুক্ত থাকে। কিন্তু স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত ও গতিশীল করতে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা করা হয়নি। ফলে বিচার বিভাগ স্বাধীন হলেও সহজে ন্যায়বিচার পাওয়া এবং রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে গিয়ে বিচার পাওয়ার কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। খন্দকার মাহবুব হোসেন আরো বলেন, আমি বহুকাল ধরে বলে আসছি মামলা জট কমানোর জন্য আইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করতে হবে। এরপর কমিশন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমাধানের উপায় বের করবে। শুধু বিচারক নিয়োগ করে এর সমাধান হবে না। অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমদিনই মামলা জট নিরসনকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, মামলা জট নিরসন করাটাই আমার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ইতিমধ্যে এই জট নিরসনে ব্যক্তিগত কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। পাশাপাশি বিচারক নিয়োগসহ আরো কিছু বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে শিগগিরই আলোচনা করবো। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক অনুষ্ঠানে বলেন, মামলা জট নিরসন ও বিচার বিভাগকে গতিশীল করতে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। এরই আলোকে সরকার বিচার বিভাগের জন্য জেলাগুলোতে বহুতল আদালত ভবন নির্মাণ কার্যক্রম এবং বিচারকদের জন্য গাড়ি সুবিধাও নিশ্চিত করেছে। প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার হচ্ছে। বিচারক নিয়োগও চলমান আছে। শিগগিরই অধস্তন আদালতে আরো ১০০ বিচারক নিয়োগ হবে। এর ফলে বিচার বিভাগে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।