শারদীয় দুর্গোৎসব: আজ মহাঅষ্টমী ও কুমারী পূজা

সুন্দর সাহা ॥ শারদীয় দুর্গোৎসবের তৃতীয় দিনে আজ মহাঅষ্টমী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। দেবী দুর্গার নবপত্রিকা প্রবেশ স্থাপন সপ্তম্যাদি কল্পারম্ভের মধ্য দিয়ে গতকাল শেষ হয়েছে মহাসপ্তমী পূজা। দেশের মন্ডপে মন্ডপে মহাসপ্তমী পূজায় ছিল না কোন মানুষের ঢল। মহামারী করোনার প্রভাব আর সরকারি ও পূজা পরিষদের কড়াকড়ি কারনে পরিবার-পরিজন নিয়ে মন্ডপগুলো ঘুরে বেড়ান পুণ্যার্থীদের দেখা মেলেনি। ঢোল আর কাশির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠলেও পূজামন্ডপ এলাকায় বিরাজ করছে কোলাহলের পরিবর্তে চরম নিস্তব্ধতা। মহাঅষ্টমীর মূল আকর্ষণ ছিল কুমারী পূজা। সেখানেও এবার রয়েছে বাধ্যবাধকতা। যশোর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অসীম কু-ু বলেন, এবার সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত হবে কুমারী পূজা। যশোরসহ সকল রামকৃষ্ণ মিশনসহ কয়েকটি স্থানে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আর মহাঅষ্টমী ও মহানবমীর মাঝেই অনুষ্ঠিত হবে সন্ধিপূজা।
অষ্টমী পূজার একটা অংশ হচ্ছে কুমারী পূজা। কুমারী পূজা হলো তন্ত্রশাস্ত্র সনাতন ধর্ম মোতাবেক ষোলো বছরের কম বয়সী কুমারী মেয়ের পূজা। শারদীয় দুর্গাপূজার অংশ হিসেবে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। প্রতিবছর দুর্গাপূজার মহাষ্টমী পূজার শেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়, তবে মতান্তরে নবমী পূজার দিনও এ পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে। সকল দেবগণের আবেদনে সাড়াা দিয়ে দেবী পুনর্জন্মে কুমারীরূপে কোলাসুরকে বধ করেন। এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়। কুমারীর মধ্যে মাতৃরূপ দর্শন, এ এক প্রাচীন রীতি। কুমারী পূজায় কোন জাতি, ধর্ম বা বর্ণভেদ নেই। দেবীজ্ঞানে যেকোন কুমারীই পূজনীয়, এমনকি বেশ্যাকুলজাত কুমারীও। তবে সাধারণত ব্রাাহ্মণ কুমারী কন্যার পূজাই সর্বত্র প্রচলিত। এক্ষেত্রে এক থেকে ষোলো বছর বয়সী যেকোনো কুমারী মেয়ের পূজা করা যায়। এদিন নির্বাচিত কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। হাতে দেয়া হয় ফুল, কপালে সিঁদুরের তিলক ও পায়ে আলতা। ঠিক সময়ে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপচারে পূজা করা হয়। চারদিক মুখরিত হয় শঙ্খ, উলুধ্বনি আর মায়ের স্তব-স্তুতিতে। রামকৃষ্ণ মিশনের সূত্র মতে, আমরা যে জগতমাতার (দেবী দুর্গা) আরাধনা করি তিনি সকল নারীর মধ্যে মাতৃরূপে আছেন। এ উপলব্ধি সকলের মধ্যে জাগ্রত করার জন্যই কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দুর্গা মাতৃভাবের প্রতীক আর কুমারী নারীর প্রতীক। কুমারীর মধ্যে মাতৃভাব প্রতিষ্ঠাই এ পূজার মূল লক্ষ্য। কুমারী পূজার আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে, দেবী দুর্গার সামনে বসিয়ে ঠিক যেভাবে তাঁর (দুর্গার) আরাধনা করা হয়, একইভাবে কুমারীকে সে সম্মান প্রদান করা হয়। শুধু মাটির প্রতিমা নয়, নারীর মধ্যেও মাতৃভাব আনা হয়। বিশুদ্ধ স্বভাবের গুণাবলী দেখে একজন নারীকে কুমারী হিসাবে নির্বাচিত করা হয়। পূজার আগ পর্যন্ত কুমারীর পরিচয় গোপন রাখা হয়।
এটা সকলেরই জানা যে ‘সন্ধি’ মানে মিলন। যুদ্ধারতা মা দুর্গা কারও সঙ্গে সন্ধি করেননি। আসলে এই মুহূর্তটি হল অষ্টমী তিথি ও নমবী তিথির মিলন সময়। যেই সময়ে দু’টি তিথির মিলন ঘটে, সেই সময়টিকে মহাসন্ধিক্ষণ বলা হয়। মা দুর্গার আরেক রূপ হল মহিষাসুর-মর্দিনী। মহিষাসুর মর্দিনী অর্থাৎ তিনি এই অসুরের নিধন করেছিলেন। কিন্তু দুর্গা পুজোর পিছনে আরো অসুরবধের কাহিনী আছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্ধিপূজা। অষ্টমী শেষ হয়ে যখন নবমী তিথি শুরু হয়ে তখন সন্ধিপূজার মাধ্যমে মায়ের আরাধনা করা হয়। এই সন্ধিপূজা হল সেই সন্ধ্যার প্রতীক যখন মা দুর্গা চন্ড ও মুন্ড নামে দুই ভয়ঙ্কর অসুরকে বধ করেছিলেন। অষ্টমী তিথির শেষ হওয়ার শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথি শুরু হওয়ার প্রথম ২৪ মিনিটকে বলা হয় সন্ধিক্ষণ। ঠিক এই সময়েই দেবী দুর্গা চন্ড ও মুন্ড নামে দুই ভয়ঙ্কর অসুরের নিধন করেছিলেন। এই ঘটনাটি মনে রাখার জন্যই প্রতি বছর অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে এই সন্ধিপূজা করা হয়। চান্দ্রমাস ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই সময়টি প্রতিবছরই পরিবর্তিত হতে থাকে। কোনো বছর এই সন্ধিক্ষণ দিনের যে কোন সময় হতে পারে। সন্ধিপূজার আয়োজনও সাড়ম্বরে করা হয়। সন্ধিপূজায় দেওয়া হয় ১০৮টি পদ্ম এবং ১০৮টি মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। নৈবেদ্যয় দেওয়া হয় গোটা ফল (লাল রঙের ফল থাকা বাঞ্ছনীয়), জবা ফুল, শাড়ি, সাদা চাল, গহনা (যদি দিতে চান) এবং বেলপাতা। প্রতিটি পারিবারিক পুজোয় এবং বারোয়ারি পুজোয় যে যার নিজের মত করে সাজিয়ে দেন ই নৈবেদ্যগুলি, কিন্তু ১০৮টি পদ্ম এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার নিয়মটি কিন্তু চিরাচরিত, এর কোনো অন্যথা হয় না। এই পুজোর বিশেষত্ব হল এই যে এই পুজায় ১০৮ টি পদ্ম ও দীপ নিবেদন করা হয়ে থাকে।

ভাগ