বাজারে চাহিদা অনুযায়ী আমিষের জোগান নেই

লোকসমাজ ডেস্ক॥ চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বেড়েছে স্বাস্থ্যসচেতনতা, বদলেছে খাদ্যাভ্যাসও। নিয়মিত খাদ্য তালিকায় এখন গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে ডিম, মাছ, মাংসের মতো আমিষজাতীয় খাবার। তবে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত জোগান নেই আমিষের। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এসব পণ্যের দাম বাড়াতে শুরু করেছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারও। এসব পণ্যের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আমদানি দুর্বলতা দূর করার সুপারিশ করেছে সরকারের একটি বিশেষায়িত গোয়েন্দা সংস্থা।
দফায় দফায় নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পর এর যৌক্তিক কারণ খুঁজতে মাঠে নামেন গোয়েন্দারা। ঢাকার পাইকারি বাজার ও খুচরা বাজার পর্যবেক্ষণ শেষে সংস্থাটির পক্ষ থেকে সাত দফা সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতিতে আমিষের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় জোগান না থাকায় ডিম, মাছ, মাংসের দাম বেড়েছে কয়েক দফায়। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগি বর্তমানে ১২০-১২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগেও ১১০-১১৫ টাকা ছিল। খাসির মাংসের দাম এক মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৫০-১০০ টাকা বেড়েছে। ডিমের বাজারও চড়া। হালিপ্রতি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা দরে।
আমিষ পণ্যের জোগানে ঘাটতির কারণ হিসেবে গোয়েন্দা সংস্থাটি বলছে, করোনাকালে পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তাছাড়া বন্যায় পশুখাদ্য ও স্থানাভাবের কারণেও গবাদিপশু ও পোলট্রি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসায় বাজার মনিটরিং জোরদার করা হলে অচিরেই বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মত তাদের।
করোনাকালে আমিষজাতীয় খাবারের পাশাপাশি চাহিদা বেড়েছে মসলাজাতীয় পণ্যেরও। বিশেষ করে আদার ব্যবহার যেমন বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে এর দামও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক মাসের ব্যবধানে বাজারে আদার মূল্য কেজিপ্রতি ১০০ টাকার বেশি বেড়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে ভারতে আদার মূল্য বেড়ে যাওয়া এবং দেশের চাহিদা অনুযায়ী ভারত-চীন থেকে কম আদা আমদানি করা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মসলা ব্যবসায়ী গোলাম মওলা বলেন, অধিকাংশ মসলাই চীন থেকে আমদানি হয়, বিশেষ করে আদা। বছর শেষে চীনে রফতানিমূল্য একটু বেশি থাকে। চীনের আদা পরিষ্কার করা সহজ হওয়ায় দেশের বাজারে এ আদার চাহিদা বেশি। তবে গুণগত মান বিবেচনা করলে কেরালার আদা সবচেয়ে ভালো। দামও কম। চীন থেকে মসলা আমদানি না করে বিকল্প উৎসগুলো থেকে আমদানির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখা যেতে পারে বলে পরামর্শ দেন তিনি।
গত জুনের শেষ দিকে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধানসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কমেছে উৎপাদনও। একটি চক্র এ সুযোগ নিয়ে চালের দাম বাড়াচ্ছে বলে জানায় গোয়েন্দা সংস্থাটি। তাদের হিসাব মতে, দেশে সারা বছরের খাদ্যশস্যের চাহিদা প্রায় তিন কোটি টন। এর মধ্যে গম, ভুট্টাসহ অন্যান্য খাদ্যশস্যও রয়েছে। গত বছর ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ২২ লাখ টন। সে হিসাবে ধান উৎপাদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে চালের মূল্যবৃদ্ধির যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। অসাধু মিল মালিক, আড়তদার ও চালের পাইকারি বিক্রেতারা অধিক মুনাফার উদ্দেশ্যে যোগসাজশে চালের মূল্য বাড়াচ্ছেন।
বাজারে ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে। খোলা সয়াবিনের দাম মানভেদে লিটারপ্রতি ৫-৭ টাকা বেড়ে ৯৩-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে ১১০-১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাম অয়েলের দাম বেড়েছে লিটারপ্রতি ২ টাকা। সয়াবিন তেল পুরোটাই আমদানিনির্ভর। এ তেল আসে মূলত ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। করোনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারেও সেই প্রভাব পড়েছে বলে মনে করে গোয়েন্দা সংস্থাটি।
নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ওপর অধিক নির্ভরশীলতা কমানোর তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, আমদানিতে শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য রফতানিকারক দেশ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারিভাবে পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসমাগ্রী আমদানি করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আগেই আমদানি নিশ্চিত করা যায়। এতে আমদানি দুর্বলতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার অস্থিতিশীল করার সুযোগ পাবেন না। কোনো ব্যবসায়ী যাতে পণ্য মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারেন, সে বিষয়ে নজরদারি জোরদার করার সুপারিশও করেছে সংস্থাটি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার স্বাভাবিক রাখতে বাজারকেন্দ্রিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে মহামারীর এ সময়ে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যদি অতিরিক্ত নিত্যপণ্য মজুদ রেখে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন, সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ভাগ