মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে শিশু সোহান : আগুনে পুড়িয়ে শিশু হত্যার চেষ্টা নানির বিরুদ্ধেই অভিযোগ

তরিকুল ইসলাম, ঝিকরগাছা (যশোর)॥ যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নের বাকুড়া গ্রামে আগুন দিয়ে শিশু আল-আমিন সোহানকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় নানি সকিরন নেছার বিরুদ্ধেই গ্রামবাসীর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, ওই সকিরন নেছা ২০১৫ সাল থেকে একের পর এক হয়রানিমুলক মামলা দিয়ে জেল খাটিয়েছে একই গ্রামের দাউদ সরদার ও পরিবারকে । এছাড়া দাউদ সরদারের নিকট থেকে দু’দফা প্রায় ১১ লাখ টাকাও নিয়েছে ওই সকিরন। এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে ওই শিশু আল-আমিন সোহান। তার বাঁচার কোন সম্ভবনা নেই বলে জানিয়েছেন সাকিরন নেছা।
শনিবার সকালে বাকুড়া গ্রামের সরোজমিনে গিয়ে গ্রামের অসংখ্য নারী-পুরুষের সাথে কথা হয়। সাংবাদকর্মীদের আসার খবর শুনে উৎসাহী হয়ে এগিয়ে এসেছেন মানুষ। এসময় কথা হয়, সিরাজুল ইসলাম (৬৫), সুন্দরী বেগম, আবু তালেব (৮০), লুৎফর রহমান (৬০), জোহরা বেগম (৪৫), মিলন হোসেন (৩৩), হাশেম আলী (৩৩), লিটন হোসেন (৪০), শাহাজান আলী (৬০), মোজাম্মেল (৭০), আবুল হোসেন (৬৫) সহ বেশ কয়েক জনের সাথে। তারা সকলেই জানান, দাউদ সরদার একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক । তিনি বাকুড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও মসজিদের সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি একজন ভাল মানুষ। পক্ষান্তরে সাকিরন নেছা ঝগড়াটে শ্রেণির মহিলা বলেও দাবি করেন তারা। দাউদ সরদার দ্বারা আগুন দিয়ে শিশু হত্যার মত জঘন্য কাজ হতে পারে না। ঐ শিশু তার নানির কাছে থাকে। নানি সাকিরন নেছা যশোরে থাকে। সে বাড়ি এসেছে কিনা তা গ্রামের কেউ জানে না। টাকা আদায় করার জন্য সাকিরন নেছা শিশুটির গায়ে আগুন দিয়ে নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাচ্ছে বলেও তারা অভিযোগ করেছেন। এসময় সুফিয়া খাতুন নামের একজন গৃহবধু জানান, দাউদ সরদার এত খারাপ মানুষ না যে, একটা বাচ্চার গায়ে আগুন দিয়ে হত্যা করবে। একটা মানুষকে এত বিপদে ফেলানো ঠিক না বলেও জানান তিনি। সাকিরন নেছার যে বাড়িতে বাচ্চাটি পুড়ে গেছে, সেখানে যাওয়ার পর ছুটে আসেন, তার দেবর আব্দুর রহমান, আব্দুর রহিম, জা রোজিনা খাতুন ও প্রতিবেশী শেফালী খাতুন। তারা জানান, গভীর রাতে শিশু আল-আমিন সোহান ও তার নানি সকিরন নেছার চিৎকার শুনে আমরা ছুটে আসি। এসে দ্রুত তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করি। তবে এখানে অন্য কেউ আগুন দিতে পারে কিনা সেই প্রশ্নের জবাবে তারা কোন কথা বলতে নারাজ। তবে একই মশারির নিচে ঘুমিয়ে থাকা শিশু সোহান পুড়ে গেলেও তার নানি সকিরন নেছা অত থাকায় সকলের মনে যথেষ্ট সন্দেহের দানা বেঁধেছে। তথ্য অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, শিশুটির জন্মের পর অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় ২০১৫ সালে সকিরন নেছার দায়ের করা মামলায় দাউদ সরদার ৮ মাস ও তার স্কুল শিক্ষিকা মেয়ে রোকেয়া খাতুন ২৩ দিন জেলে খেটেছে। জামিনে মুক্তি পেয়ে শংকরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ধাবক ও ইউপি সদস্য মহসিন আলীর মাধ্যমে ৬ লাখ টাকার মাধ্যমে মীমাংসা হয়েছিল। এ ঘটনার প্রায় তিন বছর পর ওই শিশু বেঁচে আছে মর্মে তার পিতৃত্বের দাবিতে আবারো মামলা করে সকিরন নেছা। সেই মামলায় বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যেমে শিশু আল-আমিন সোহান দাউদ সরদারে পুত্র বলে সনাক্ত হয়। এসময় দাউদ সরদার তার সন্তানকে দাবি করলে শিশুটির নানি সকিরন নেছা দিতে রাজি হয়নি। ফলে শিশুটির বয়স ১২ বছর পর্যন্ত তার নানির হেফাজতে থাকবে মর্মে বিজ্ঞ আদালত দাউদ সরদারকে এককালীন ৫ লাখ টাকা দেয়ার নির্দেশ দেন। সে মোতাবেক চলতি বছরের ফেব্র“য়ারিতে দাউদ সরদার বিজ্ঞ আদালতে ৫ লাখ টাকা জমা দেন। দাউদ সরদার ও তার পরিবার জানান, দু‘দফায় তিনি ১১ লাখ টাকা দিয়েছেন। শিশুটিকে নিয়ে তার নানা-নানি যশোর সদরের এড়েন্দা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করেন। তারা কেউ গ্রামে থাকেন না। চলতি মাসের ৫ তারিখে ওই মামলার হাজিরা ছিল। আগামী ১ নভেম্বর মামলার রায় হওয়ার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে এ ঘটনা খুবই দুঃখজনক। প্রতিবেশী অনেকেই বলেছেন, ঘটনার দিন কখন সকিরন ওই শিশুটিকে নিয়ে বাড়িতে এসেছেন তা কেউই জানেন না। তবে প্রতিবেশী শেফালী খাতুন বলেন সন্ধ্যার বেশ কিছু পর নাতীকে সাথে নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন। তাকে ঘুমিয়ে রেখে শেফালীর বাড়িতে গিয়ে বেশ রাত পর্যন্ত গল্প করেছিলেন বলেও জানান তিনি। বর্তমানে শিশু আল-আমিন সোহানকে বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন দেয়া অবস্থায় চিকিৎসা চলছে। এ ব্যাপারে সাকিরন নেছার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর করা সকল অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন। উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর গভীর রাতে ঝিকরগাছার বাকুড়া গ্রামে শিশু আল-আমিন সোহান ঘুমন্ত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হয়েছে।

ভাগ