টানা চতুর্থ মাসের মতো বাড়ল খাদ্যপণ্যের দাম

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥সেপ্টেম্বরে টানা চতুর্থ মাসের মতো বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফওএ)। খাদ্যশস্য আর ভোজ্যতেলের দাম খুব বেশি পরিমাণে বেড়েছে বলেই এ মাসে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের (খাদ্যশস্য, তেলবীজ, দুগ্ধজাত পণ্য, মাংস ও চিনি) বাজার নিয়ে ‘এফএও ফুড প্রাইস ইনডেক্স (এফএফপিআই)’ শীর্ষক মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। খবর রয়টার্স।বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়লেও গত মাসে বৈশ্বিক মূল্যসূচক কমেছে চিনি ও মাংসের। মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল দুগ্ধজাত পণ্যের দাম।
নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিকভাবে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বর মাসেও দাম বেড়েছে। গত মাসে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ৯৭ দশমিক ৯ পয়েন্টে, যা আগস্টে ছিল ৯৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ আগের মাসের তুলনায় সূচক বেড়েছে ২ শতাংশ। এটি এক বছর আগের তুলনায় ৪ দশমিক ৬ পয়েন্ট (৫ শতাংশ) বেশি।
রোমভিত্তিক এফএও এক বিবৃতিতে জানায়, খাদ্যশস্যের দাম ২০২০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে, যদিও তা পূর্বাভাসের চেয়ে কমই। সংস্থাটির খাদ্যশস্যের সূচক সেপ্টেম্বরে আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং যা এক বছর আগের এ সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। খাদ্যশস্যের গড় মূল্যসূচক ১০৪ পয়েন্ট, যা আগস্টের চেয়ে ৫ পয়েন্ট (৫.১ শতাংশ) বেশি।
এফএও বলছে, ‘গমের মূল্যবৃদ্ধিই বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। দক্ষিণ গোলার্ধে উৎপাদন কমে যাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় এবং ইউরোপব্যাপী শুষ্ক আবহাওয়া শীতের সময় গম বপনের কাজকে বাধাগ্রস্ত করবে, এমন পূর্বাভাসের পরই মূলত বিশ্বব্যাপী গমের বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে ও পণ্যটির দাম বেড়ে যায়।’
ভুট্টা, জোয়ার ও বার্লির দামও বেড়েছে। ভুট্টার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ, বিশেষ করে ইউরোপীয় অঞ্চলে এর উৎপাদন কমে যাওয়ার খবর আর যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার আভাস। চীনে চাহিদার ঊর্ধ্বগতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জোয়ারের দাম টানা তৃতীয় মাসের মতো বেড়েছে।
যদিও বিশ্বব্যাপী চালের দাম কমেছে। করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমান প্রেক্ষাপটে চাহিদা খানিকটা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনায় চালের দরপতন ঘটেছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভোজ্যতেলের গড় মূল্যসূচক ১০৪ দশমিক ৬ পয়েন্ট, আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে ৬ শতাংশ। এ নিয়ে টানা চার মাস ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তির দিকে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে ভোজ্যতেলের গড় মূল্যসূচক গত জানুয়ারির পর সর্বোচ্চে উঠেছে। এর কারণ বিশ্বজুড়ে মহামারীর প্রকোপ। নভেল করোনাভাইরাস মহামারীতে মানুষ ঘরবন্দি হয়ে থাকার কারণে বিশ্বজুড়ে ভোজ্যতেলের উৎপাদন শ্লথ হয়ে এসেছে। গত মাসে বাজারে পামওয়েল, সূর্যমুখী তেল ও সয়াবিন তেল সব পণ্যের দামই বাড়তির দিকে ছিল।
গত মাসে দুগ্ধজাত পণ্যের মূল্যসূচকে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি। গড় মূল্যসূচক ১০২ দশমিক ২ পয়েন্ট, যা আগের মাসের চেয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। দাম বেড়েছে মাখন, পনির ও ননিযুক্ত গুঁড়ো দুধের। গুঁড়ো দুধের সামগ্রিক উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণেই এসব দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বেড়েছে।
২০২০-২১ মৌসুমে বিশ্বব্যাপী চিনির উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার খবরে পণ্যটির দাম সেপ্টেম্বর মাসে কমেছে। চিনির গড় মূল্যসূচক ৭৯ পয়েন্ট, আগস্ট মাসের তুলনায় চিনির মূল্যসূচক কমেছে গড়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ আগস্ট মাসে এর মূল্যসূচক বেড়ে গিয়েছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। মূলত ভারত ও ব্রাজিলে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার কারণেই চিনির মূল্য কমেছে।
মাংসের মূল্যসূচকও কমেছে আগের মাংসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে মাংসের গড় মূল্যসূচক ৯১ দশমিক ৬ পয়েন্ট। এক বছর আগের তুলনায় যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ কম। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে চীন। জার্মানি থেকে শূকরের মাংস আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি। মূলত ইউরোপের সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ জার্মানিতে আফ্রিকান সোয়াইন ফিভার শনাক্ত হওয়ার পরই চীন এমন সিদ্ধান্ত নেয়, তাতে বৈশ্বিক মাংসের বাজারেও বড় প্রভাব পড়ে।
মূলত খাদ্যপণ্যের বাড়তি দামের মধ্য দিয়ে ২০২০ সালের শুরু হয়েছিল। জানুয়ারিতে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের গড় মূল্যসূচক ছিল ১০২ দশমিক ৫ পয়েন্ট। পরের মাসে তা কমে দাঁড়ায় ৯৯ দশমিক ৪ পয়েন্টে। মার্চ ও এপ্রিলে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের গড় মূল্যসূচক ছিল যথাক্রমে ৯৫ দশমিক ১ পয়েন্ট ও ৯২ দশমিক ৪ পয়েন্ট। মে মাসে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক আরো কমে ৯১ পয়েন্ট নেমে আসে, যা আগের ১৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
যদিও টানা কয়েক মাসের পতন কাটিয়ে গত জুন মাসে বেড়ে যায় খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক। ওই মাসে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক ছিল ৯৩ দশমিক ১ পয়েন্ট। জুলাইয়ে এ সূচক আগের মাসের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ দশমিক ২ পয়েন্টে। আর আগস্টে তা পৌঁছে ৯৫ দশমিক ৯ পয়েন্টে, যা ছিল ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেপ্টেম্বরে এ সূচক পৌঁছল ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশে।
বিশ্বব্যাপী দানা শস্যের চাহিদা কমে যেতে পারে, এ আশঙ্কা থেকে এফএও ২০২০ সালে তাদের আগের পূর্বাভাস থেকে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন কম খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে বলে জানায়। আগের পূর্বাভাস থেকে কমালেও সংস্থাটির আশা, এখনো চলতি বছর রেকর্ড ২ দশমিক ৭৬২ বিলিয়ন টন ফসল উৎপাদিত হবে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
২০২০-২১ মৌসুমে বিশ্বে খাদ্যশস্যের চাহিদার পূর্বাভাস ছিল ২ দশমিক ৭৪৪ বিলিয়ন টন, যা সেপ্টেম্বরে কমেছে ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন। এর পরও ২০১৯-২০ মৌসুমের তুলনায় তা ৫৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন বেশি। ২০২১ মৌসুমের শেষে বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের মজুদ থাকবে ৮৯০ মিলিয়ন টন, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন কম হলেও এতেই নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হবে।