শেখ আব্দুল হাকিম,শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) ॥ শিক্ষা অধিদফতর থেকে উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবকাঠামো মেরামত খাতে ১২টি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে শিক্ষা অফিসারসহ চার সহকারী শিা অফিসারের বিরুদ্ধে ৯০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলায় ১৯১টি বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের বরাদ্দের চেক ছাড় পেতে শিক্ষকদের ৯০ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫০ টাকা শিক্ষা অফিসারদের ঘুষ দিতে হয়েছে। এ ঘুষ আদায়ের পেছনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার যোগসাজশ আছে বলেও শিক্ষকরা দাবি করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ ও ২০ অর্থ বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবকাঠামো মেরামতে শিা অধিদফতর হতে শ্যামনগরে ১৯১টি স্কুলে ১২টি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪ কোটি ৯১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৫৮টি স্কুলে পিইডিপি-৪ মাইনর মেরামত খাতে বরাদ্দ ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত ৪২টি স্কুলে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪৫ লাখ ৫ হাজার টাকা। ১৯১টি বিদ্যালয়ে স্লিপ খাতে বরাদ্দ ১ কোটি ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা, ১৩১টি বিদ্যালয়ে রুটিন মেইনটেনেন্স খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ১৯১টি স্কুলে প্রাক প্রাথমিক খাতে বরাদ্দ ১৯ লাখ ১০ হাজার টাকা, ১৬টি স্কুলে ক্ষুদ্র মেরামত খাতে বরাদ্দ ২৪ লাখ টাকা। ৮টি বিদ্যালয়ে খেলার সামগ্রী খাতে বরাদ্দ ১২ লাখ টাকা, ৩টি বিদ্যালয় অস্থায়ী গৃহ র্নিমাণ খাতে ৯ লাখ টাকা। ৩টি বিদ্যালয়ে এডুকেশন ইন এমারজেন্সি খাতে বরাদ্দ ৬ লাখ টাকা। ২০টি বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লক খাতে বরাদ্দ ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা ও ১টি বিদ্যালয়ে (নুরনগর) মেরামত খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। উল্লেখ্য ১৮-১৯ অর্থ বছরে ১৫১টি স্কুলে স্লিপ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয় ৯৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। উল্লিখিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে পিইডিপি-৪ মাইনর মেরামত খাত হতে ১৫% হারে ঘুষ আদায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ঘূর্ণিঝড় আম্পান খাত হতে ২৬% হারে ঘুষ আদায় ১১ লাখ ৭১ হাজার ৩ শ টাকা। প্রাক প্রাথমিক ও স্লিপ খাত হতে স্কুল প্রতি ২ হাজার টাকা হারে ঘুষ আদায় ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা। রক্ষণাবেক্ষণ খাত হতে ১০% হারে ঘুষ আদায় ৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ক্ষুদ্র মেরামত খাত হতে ১৫% হারে ঘুষ আদায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। খেলার সামগ্রী খাত হতে ১৫% হারে ঘুষ আদায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অস্থায়ী গৃহ র্নিমাণ খাত হতে ১৫% হারে ঘুষ আদায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এডুকেশন ইন এমারজেন্সি খাত হতে ১৫% হারে ঘুষ আদায় ৯০ হাজার টাকা। ওয়াশব্লক খাত হতে ১০% হারে ঘুষ আদায় ৫৯ হাজার টাকা। একটি ¯ু‹লে মেরামত খাত হতে ১৫% হারে ঘুষ আদায় ২২ হাজার ৫ শ টাকা। এ ছাড়া ২০১৯ অর্থ বছরে স্লিপ খাতে বরাদ্দ হতে ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন কেনা থেকে শিক্ষা অফিসার আক্তারুজ্জামান মিলন হাতিয়ে নেন ২৭ লাখ ৪৮ হাজার ২ শ টাকা। জেডকেটিকো মডেল নং কে ৫০ এ নামীয় ডিজিটাল হাজিরা মেশিনটির বাজার মূল্য ছিল ৬ হাজার ৮ শ টাকা। অথচ শিক্ষা অফিসার মেশিনটির ওয়ারেন্টির অজুহাত দেখিয়ে প্রতিটি মেশিন বাবদ ২৫ হাজার টাকা কর্তন করেন। শিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রধান শিক সিরাজুল ইসলাম, ১২৭ নং স্কুলে প্রধান শিক হোসেন আলী জানান, ১৯ অর্থ বছরে ১৯১টি স্কুলের মধ্যে ১৫১টি স্কুলে স্লিপ খাতের আওতায় আর ৪০টি স্কুল সি.এফ.এস এর আওতাধীন ছিল। শিা অধিদফতরের নির্দেশনা ছিল স্লিপ খাতের বরাদ্দের টাকা স্ব-স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে। যাতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সভাপতি ও সংশ্লিষ্টরা বাজার যাচাই বাছাই করে হাজিরা মেশিন কিনবেন। কিন্তু উপজেলা শিা অফিসার পরিপত্রের নির্দেশনা না মেনে উল্টোটা করেছেন। স্লিপ খাতের সমুদয় টাকা থেকে হাজিরা মেশিন কেনা বাবদ ২৭ হাজার ৫ শ টাকা কেটে নিয়ে বাকি টাকা স্ব-স্ব স্কুলের নামে চেক প্রদান করেন। যা অ্যাকাউন্ট চেক করলে প্রমাণ মিলবে। তবে,জেডকেটিকো মডেল নং কে ৫০ এ নামীয় ডিজিটাল হাজিরা মেশিনটির বাজার মূল্য ৬ হাজার ৮ শ টাকা। কিন্তু শিক্ষা অফিসার মেশিন বাবদ অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিলেও অনেক স্কুল এখনও পর্যন্ত হাজিরা মেশিন পায়নি বলে জানান।
১০১ নং হাজিপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক কানাইলাল মল্লিক, ১১০ নং সোরালক্ষীখালি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী, ১৬৬ নং ধানখালি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হরষিত মন্ডল, ১৭১ নং টেংরাখালি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম, ১৬৭ নং-পূর্ব পরানপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম, ৫৮ নং-যাদবপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাজমা বেগম, ৪২ নং নওয়াবেকী স্কুলের প্রধান শিক্ষকা জেসমিন নাহার, ১৮৭ নং আস্তাখালী স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাদের,১১৪ নং বাইনতলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক দীপংকর কুমার ঘোষ জানান,বরাদ্দের চেক পেতে ১৫% আর আম্পান খাতে ২৬% হারে টাকা ও ভ্যাট ১২% হারে কেটে নিয়েছে। ১৪৪ নং বন্যতলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাকিম জানান, আম্পানের বরাদ্দকৃত দেড় লাখ টাকা ছাড় পেতে শিক্ষা অফিসারের সামনে সহকারী শিক্ষা অফিসার সোহাগ আলমের হাতে ৪০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
৪২ নং মরাগাং স্কুলের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন.(সচিব) ৩১। শ্রীফলকাটি স্খুলের প্রধান শিক্ষক আকিকুর রেজা (সচিব) সহ অন্যান্য শিক্ষক (সচিবরা) জানান, সহকারী শিক্ষা অফিসারদের নির্দেশে স্ব-স্ব স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে বরাদ্দের ১৫% হারে টাকা আদায় করে শিক্ষা অফিসে জমা দিয়েছি। এ বিষয় উপজেলা শিক্ষা অফিসার আক্তারুজ্জামান মিলন ও সহকারী শিক্ষা অফিসার শাহআলম, আজহারুল ইসলাম, সোহাগ হোসেন, সোহাগ আলম এর সাথে কথা হলে ১২% হারে ভ্যাট ও ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন কেনা থেকে ২৫ হাজার টাকা নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। কিন্তু ১২টি প্রকল্প থেকে ৯০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। শিক্ষা অফিসারদের পাহাড়সম দুর্নীতির খবরটি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় নিজেরাই বাঁচতে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ.ন.ম আবুজর গিফারীকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে গিয়ে ব্যর্থ হন সহকারী শিক্ষা অফিসার শাহআলম। এ বিষয়ে নির্বাহী অফিসার আ.ন.ম আবুজর গিফারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাকে ঘুষ দিতে চাইলে আমি বলি আপনাদের সাহস হলো কী করে আমাকে ঘুষ দিতে চান।’ এদিকে সহকারী শিা অফিসার শাহআলম শিক্ষা অফিসারের বরাত দিয়ে বলেন, আমি ইউএনও অফিসে যেতে চাইনি, কিন্তু শিক্ষা অফিসার চাচার ভয় দেখান, তাই আমি নিরুপায় হয়ে ওই টাকার প্রস্তাব দিলে ইউএনও স্যার ভাল মানুষ হওয়ায় টাকা না নিয়ে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউল হক দোলন বলেন, আইনের উর্ধ্বে কেউ নন। প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসাররা আইনবর্হিভূত কাজ করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ বিভাগ) এর আবুল কাশেম মিয়াকে শ্যামনগর শিক্ষা অফিসারদের দুর্নীতির ঘটনাটি অবহিত করলে তিনি বলেন, ‘শ্যামনগর শিক্ষা অফিসারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তে অনেক শিক্ষকরা লিখিত ভাবে প্রমাণ দিয়েছে।’ সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জগলুল হায়দার বলেন, ‘শ্যামনগরে শিক্ষা অফিসারাদের দুর্নীতির ঘটনা অত্যান্ত দুঃখজনক। এসব দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা অফিসারের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি অনেকটা ক্ষুন্ন হচ্ছে। আমি তাদের বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানাই ।’





