লোকসমাজ ডেস্ক॥ সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল কেএস নবীর দুই নাতিকে বাড়িতে ফিরিয়ে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মধ্যরাতে বসেছিল আদালত। ওই দুই শিশুকে তাদের দাদার বাড়ি ফেরাতে শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে আদালত বসিয়ে ধানমণ্ডি থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) নির্দেশ দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ সাইফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
জানা গেছে, রাজধানী ধানমণ্ডির একটি চারতলা বাড়ির মালিক সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল কেএস নবী। সম্প্রতি তার ছোট ছেলে সিরাতুন নবী মারা যান। এরপর থেকে সিরাতের দুই ছেলে কাজী আদিয়ান নবী ও কাজী নাহিয়ান নবীকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এর আগে শিশু দুটির বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটনা ঘটে। বাবার মৃত্যু হলে শিশু দুটি কিছুদিনের জন্য তার মায়ের আশ্রয়ে থাকতে যায়। মায়ের কাছ থেকে নিজ বাসায় ফেরার চেষ্টা করে ওই দুই শিশু। এ বিষয়ে ধানমণ্ডি থানাকে জানানো হয়। তবে পুলিশের অনুরোধেও শিশুদের বাড়িতে প্রবেশ করতে দেননি তাদের চাচা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী রেহান নবী। শিশু দুজনের ফুফু মেহরীন আহমেদ বলেন, বাড়িটি এখনো কেএস নবীর নামে। সেদিক থেকে দেখলে ওই শিশু দুটিও ওই বাড়ির মালিক।
ঘটনাটি নিয়ে রবিবার দিবাগত রাত ১২টায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টিভির একাত্তর জার্নালে একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এ সময় একাত্তর জার্নালে শিশু দুটির সঙ্গে তাদের ফুফু, সাংবাদিক রেজওয়ানুল হক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ভার্চুয়ালি আলোচনায় যুক্ত ছিলেন। একাত্তর জার্নালের অনুষ্ঠানটি প্রচারকালে বিষয়টি নজরে আসে বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ সাইফুর রহমানের। এরপর প্রচারিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে তিনি মাঝরাতে হাইকোর্টের বেঞ্চ বসিয়ে আদেশ দেন। মনজিল মোরসেদ বলেন, আমি বাচ্চা দুটির অধিকার সম্পর্কে কথা বলতে একাত্তর জার্নালের লাইভে যুক্ত ছিলাম। পরে আদেশের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারি। ধানমন্ডি থানাকে রবিবার সকালে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলে আদালত আদেশ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। এদিকে রবিবার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল কেএস নবীর দুই নাতির সার্বিক নিরাপত্তা দিতে ধানমণ্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। ১১ অক্টোবর এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের দিন রেখে ওই দিন উভয় পকে (দুই শিশু ও তাদের চাচা কাজী কাজী রেহান নবী) লিখিত ব্যাখ্যাসহ আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে। সেদিন দুই শিশুকে আদালতে হাজির করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ধানমণ্ডি থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়াকে। দুই শিশুর বাসায় ফেরা নিয়ে শনিবার মধ্যরাতে দেওয়া উচ্চ আদালতের আদেশের বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দেখে বিচারপতি বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ রোববার এ আদেশ দেয়। ভার্চুয়াল আদালতে ধানমণ্ডি থানার ওসির বাস্তবায়ন প্রতিবেদন তুলে ধরেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ওয়ায়েস আল হারুনী।
আদেশে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, “আগামী ১১ অক্টোবর উভয় পকে আদালতে আসতে বলা হয়েছে ঘটনার লিখিত ব্যাখ্যাসহ। সে পর্যন্ত নাবালকদ্বয়ের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য ধানমণ্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হল।” ওসি ইকরামকে উদ্দেশ্য করে বিচারক বলেন, “আপনি ১১ অক্টোবর পর্যন্ত জাস্ট এক-দুজন পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ নেবেন তারা ঠিক আছে কিনা, এটা শুধু মনিটরিং করেন। এই শিশুদের মনে একটা ভয়-ভীতি আছে, ফলে তারা নিরাপদ বোধ করবে না। “আজকের আদেশটা বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিব। আর ধানমণ্ডি থানাকে বলছি, যিনি বাচ্চাদের বের করে দিয়েছেন, ওই বাসায় গিয়ে তাকে বলবেন আদালত বলেছেন, কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত বা পদপে না নিতে। সবাই যেন বাসায় অবস্থান করেন। তাদের বাড়ির নিরাপত্তা তাদেরকেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। পুলিশ মানুষের জীবন রা করতে পারে না। আমরা নিজেরা নিজেরা যদি সচেতন না হই তাহলে কিছু হবে না। সুতরাং ব্যারিস্টার কাজী রেহান নবীকে বলবেন বাচ্চাদের যাতে কিছু না হয়।”
“উভয় পই যেন সচেতন থাকে। নাবালক যে দুই শিশু আছে তাদের বলবেন, সংযত আচরণ করতে। সংযত আচরণ করে যেন তারা বাড়িতে অবস্থান করে। কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা যাতে না দেখায়। নাবালক বলতে আমরা যেমনটা ভাবছি সেরকম নয়। নাবালকদেরও আমরা দেখছি অপরাধ করতে। সুতরাং পুলিশ দিয়ে আগামী তারিখ পর্যন্ত বাচ্চাদের নিরাপত্তা দিবেন। এই শিশু দুটিকে নিয়ে আপনি কোর্টে আসবেন। আইনজীবী যদি থাকে তিনিও আসবেন।” ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে দায়িত্বপালন করা কেএস নবী ২০১৮ সালে মারা যান। তার দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে কাজী রেহান নবী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। ছোটো ছেলে সিরাতুন নবী গত ১০ আগস্ট মারা যান। সিরাতুন নবীর দুই ছেলেকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না তাদের চাচা কাজী রেহান নবী।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী রেহান নবী রোববার বলেন, “আমি সময়মত বিষয়টা কারিফাই করব। আমার শরীরটা একটু খারাপ। পাঁচ দিন ধরে জ্বরে পড়ে আছি। আমি পুরো বিষয়টা নিয়ে রিজয়েন্ডার দেব। আপনি পরে যোগাযোগ করেন, আমি পুরো জিনিসটা কারিফাই করব।” তাহলে আসলে কী ঘটেছিল প্রশ্ন করলে এই আইনজীবী বলেন, “আপনি তো সবই ওয়ান সাইডেড শুনেছেন। একটা গল্পের বিপরীত বা অন্য একটা দিকও থাকে সবসময়। যেটা ওরা আমাকে বাধ্য করতেছে, যেটা আমি বলব এবং দরকার হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাব। আমার আব্বা উনার (প্রধানমন্ত্রীর) খুব কোজ ছিলেন। আমাকে কয়েকটা দিন সময় দেন, তারপর অবশ্যই আমি বলব।”





