পাচার হওয়া বিপুল অর্থ ফেরত আনতে হবে

0

বাংলাদেশ থেকে মুদ্রাপাচারের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। অ্যান্টি মানি লন্ডারিং ইনডেক্স (এএমএল) ২০২০ অনুযায়ী ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি মুদ্রাপাচারকারী দেশের তালিকায় আরো সাত ধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ৩৮তম। ১৪১টি দেশের মধ্যে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৪৫তম এবং ২০১৭ সালে ছিল ৮২তম। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে মুদ্রাপাচারে বাংলাদেশ এক নম্বর না হলেও শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে স্থান করে নেবে। দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি মুদ্রা পাচার করেন অসাধু ব্যবসায়ীরা ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। এর পরই রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদরা। সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ ক্যাসিনো কারবার, মানবপাচার, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকেও বিদেশে মুদ্রাপাচারের পরিমাণ বেড়েছে। সম্প্রতি এসব অপরাধে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের প্রায় সবারই বিপুল পরিমাণ মুদ্রাপাচারের প্রমাণ মিলছে। তাঁদের মধ্যে ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নিশান মাহমুদ শামীম একাই পাচার করেছেন দুই হাজার কোটি টাকা। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট পাচার করেছেন ১৯৫ কোটি টাকা। এভাবে মুদ্রাপাচার কবে থামবে, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করা যাবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।
মুদ্রাপাচার শুধু যে একটি দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি করে তা নয়, আরো অনেকভাবেই ক্ষতি করে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার অর্থ জোগানেও বড় ভূমিকা রাখে এই মুদ্রাপাচার। মাদক ও সোনা চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধেও ব্যবহৃত হয় এই অর্থ। বর্তমান সরকার এসবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দিয়েছে। এর পরও বাংলাদেশ থেকে মুদ্রাপাচার কমছে না কেন? মুদ্রাপাচার রোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কী করছে? ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য বলছে, শুধু ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। গত সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে পাঁচ হাজার ২৭০ কোটি ডলার বা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। এদিকে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। তথ্যানুযায়ী কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মুদ্রাপাচারকারী দেশ ছিল ভারত। তাদের গৃহীত বিভিন্ন ব্যবস্থার কারণে ভারতে মুদ্রাপাচারের পরিমাণ অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। তাহলে বাংলাদেশ কেন পারছে না মুদ্রাপাচার কমাতে? সংশ্লিষ্ট অনেকেই অভিযোগ করেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। মুদ্রাপাচার রোধে আমাদের আরো কঠোর হতেই হবে। মুদ্রাপাচার রোধে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। জিরো টলারেন্স নীতি শুধু মুখে নয়, বাস্তবে দেখাতে হবে। আমরা মনে করি, জাতি প্রত্যাশা করে সরকার পাচার হওয়া সমুদ্বয় টাকা ফেরত আনবে।