ক্রিকেট শুরুর সম্ভাবনায় আনন্দের সঙ্গে আছে উৎকণ্ঠাও

লোকসমাজ ডেস্ক॥ শ্রীলঙ্কা সিরিজ বাতিল হওয়ার শঙ্কায় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেট শুরুর। যদিও সেটি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ কিংবা জাতীয় ক্রিকেট লিগ দিয়ে নয়, শ্রীলঙ্কা সিরিজ না হলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) চার দল নিয়ে করপোরেট লিগ আয়োজনের চিন্তা-ভাবনা করছে। আর তাতেই জাতীয় দলের বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের মনে খুশির আমেজ। যদিও কিছু কিছু সিনিয়র ক্রিকেটারের আবার মনও খারাপ হয়েছে! সব মিলিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু নিয়ে ক্রিকেটারের মধ্যে আনন্দের সঙ্গে আছে উৎকণ্ঠাও।
গত মার্চে জিম্বাবুয়ে সিরিজের পর শুরু হয়েছিল ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। কিন্তু করোনা সংক্রমণের পর ১৬ মার্চ থেকে দেশের ক্রিকেটই বন্ধ করতে বাধ্য হয় বিসিবি। সব সময়ের মতো করোনাকালের এই সময়টাতে ঘরোয়া ক্রিকেট এবং দেশের বেশির ভাগ ক্রিকেটার ছিলেন বিসিবির ভাবনার বাইরে। তবে বাংলাদেশ দলের শ্রীলঙ্কা সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াতে আবার আলোচনায় ঘরোয়া ক্রিকেট। সোমবার বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান নিজেই ঘরোয়া ক্রিকেট শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। তার ঘোষণার পরপরই জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটারদের মধ্যে নানমুখী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কেউ খুশিতে আত্মহারা, আবার কেউ ভাবছেন চার দল নিয়ে সম্ভাব্য টুর্নামেন্টের দলে জায়গা হবে তো? নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা সিনিয়র এক ক্রিকেটার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘প্রথম কথা কখনোই চাই না জাতীয় দলের শ্রীলঙ্কা সফর বাতিল হোক। যদি হয়ই, বিসিবির উচিত হবে ঢাকা লিগ শুরু করা। কিন্তু যতদূর শুনেছি বিসিবি লিগ নিয়ে কিছুই ভাবছে না। তাদের ভাবনায় কয়েকটি দল নিয়ে কোনও একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা। এমন একটি টুর্নামেন্ট হলে আমার মতো অনেকেই দল পাবেন না। কেননা চার দলে ৬০ জন ক্রিকেটারের বেশি খেলার তো সুযোগ নেই। জাতীয় দল, এইচপি ও অনূর্ধ্ব-১৯ দল মিলিয়ে ক্রিকেটারের সংখ্যা তো কম নয়। সুতরাং ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলোয়াড়রা যে আর্থিক সমস্যায় ভুগছে, তার সমাধান হবে না।’
আল-আমিন জুনিয়র, গত কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত মুখ। দেশের ক্রিকেট শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দারুণ খুশি এই ব্যাটিং অলরাউন্ডার। তবে অনেক সতীর্থের কথা মনে করে কিছুটা চিন্তায় তিনি, ‘ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু হওয়াটা আমাদের জন্য খুশির বিষয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সিরিজ হলে তো আবার এই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এটা জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটারদের জন্য হতাশার হবে। আমি কখনোই চাই না শ্রীলঙ্কা সিরিজ বাদ হয়ে যাক। কিন্তু বিসিবির আমাদের কথাও ভাবা উচিত। আমরা ৬ মাস ধরে ক্রিকেটের বাইরে। আর্থিকভাবে অনেকের অবস্থা খুবই নাজুক। এই অবস্থায় আরও কয়েক মাস বিলম্ব হলে অনেকের জীবন চালানো কষ্ট হয়ে যাবে।’ আল-আমিন মনে করেন, ঢাকা লিগ কিংবা জাতীয় লিগ দিয়েই ঘরোয়া ক্রিকেট ফেরানো উচিত। কেননা করপোরেট লিগ হলে কেবলমাত্র কিছু ক্রিকেটার উপকৃত হবে। এ প্রসঙ্গে ২৬ বছর বয়সী অলরাউন্ডারের বক্তব্য, ‘করপোরেট লিগ হলে হয়তো ৪০ কিংবা ৬০ জন ক্রিকেটার খেলতে পারবে। সেই সংখ্যায় আবার জাতীয় দল, এইচপির ক্রিকেটাররা থাকবে। যারা কেবলমাত্র প্রিমিয়ার লিগে খেলে, সেই ধরনের খেলোয়াড় সুযোগ পাবে না। সুতরাং যাদের একমাত্র রুটি-রুজি প্রিমিয়ার লিগ, তারা কীভাবে তাদের আর্থিক কষ্ট দূর করবে। খেলা হলেই কেবল ক্রিকেটাররা আর্থিক সাপোর্ট পাবে। আমি মনে করি, বিসিবির সেই টুর্নামেন্টই চালু করা উচিত, যেখানে সব খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবে।’
পরিচিত ক্রিকেটারদের আর্থিক কষ্টের কথা তুলে ধরে আল-আমিন বলেছেন, ‘বিশ্বাস করবেন কিনা, আমার পরিচিত অনেক ক্রিকেটার আছে যাদের নিজেদের সঞ্চয় ভেঙে খেয়ে শেষ। এখন ধার-দেনা করে চলছে। আশায় আছে, ক্রিকেট খেলে ঋণ শোধ করার। কিন্তু খেলার সুযোগ না পেলে কীভাবে তারা ঋণ শোধ করবে।’ আল-আমিনের মতো শামসুর রহমানও দ্বিধায়, ‘খবরটা শুনে খুশিই লাগছে। কিন্তু আমি চাই না জাতীয় দলের সফর বাতিল হোক। আমি চাই জাতীয় দলের সফরের পাশাপাশি আমরা যারা বাইরে আছি, তারাও যেন খেলায় ফিরতে পারি। আমরা তো সবাই পেশাজীবী ক্রিকেটার। আমাদের সবার রুটি-রুজি এটাই। সুতরাং কেবল খেলার জন্যই না, আমাদের জীবন বাঁচাতে হলেও ক্রিকেট শুরু হওয়া দরকার। আমি হয়তো বিসিবি থেকে কিছু বেতন পাই, আমাদের সঙ্গে খেলে এমন অনেকেই আছে, যারা খুব অসহায় জীবনযাপন করছে। এই কারণেই ঘরোয়া ক্রিকেট শুরুর পরিকল্পনার খবর শুনে আমি খুশি। আমার মতো অনেকেই খুশি।’ জাতীয় দলের হয়ে খেলা আরেক সিনিয়র ক্রিকেটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘বিসিবি সান্তনা পুরস্কার হিসেবে হয়তো একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে। কিন্তু সেই আয়োজনে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা উপকৃত হলেও সাধারণ ক্রিকেটারদের কোনও লাভ হবে না। শ্রীলঙ্কা সিরিজ বাতিল হোক আর সফর হোক, বিসিবির উচিত ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু করা। আর সেটি ঢাকা লিগ দিয়েই।’

ভাগ