তিতাসের তদন্ত প্রতিবেদন : বিদ্যুতের লাইন পরিবর্তনের সময় সুইচ টিপলেই বিস্ফোরণ

লোকসমাজ ডেস্ক॥ পাইপ লাইনের লিকেজ থেকে মসজিদের ভেতরে গ্যাস জমে যায়। আর মুয়াজ্জিন বিদ্যুতের লাইন পরিবর্তনের সময় সুইচ টিপলেই তা থেকে ঘটে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। টানা ৯ দিন অনুসন্ধান করে তিতাসের তদন্ত কমিটি এমনই তথ্য পেয়েছে। যদিও দুর্ঘটনার পর থেকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এই একই কথা বলে আসছিল। আর তিতাস দুর্ঘটনার পর পাইপ লাইন খুঁড়ে তাতে লিকেজ থাকার প্রমাণ পায়।
উল্লেখ্য, গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে এশার নামাজ আদায়ের সময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩১ জন মারা গেছেন। বিস্ফোরণের পর ৩৭ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দগ্ধ অবস্থায় ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অন্য দগ্ধদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এক ব্যক্তি কেবল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।এ ঘটনায় তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে পাঁচ দিনের সময় দেওয়া হয়। সেই হিসাবে গত ১০ সেপ্টেম্বর তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও কমিটি আরও চার কর্মদিবস সময় চায়। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সেই চার কর্মদিবসের শেষ দিন ছিল।
তিতাস সূত্র জানায়, এই প্রতিবেদন লেখার সময় বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করছিল তদন্ত কমিটি। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে এই প্রতিবেদন তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকে কাছে জমা দেওয়া কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে তিনটায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সচিবালয়ে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানা যায়। তদন্ত কমিটির সূত্র জানায়, তিতাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পরও যে লিকেজ মেরামত না করার অভিযোগ উঠেছে, তা সঠিক নয়। এর কোনও তথ্য-প্রমাণ তদন্ত কমিটিকে কেউ দেখাতে পারেনি। এই ঘটনায় তিতাসের মতো কোম্পানির সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় যারা মারা গেছেন এবং যারা আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন, সবার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে পুরো ঘটনার দায় চাপানো হয়েছে মসজিদ কমিটির ওপর বলে জানা গেছে। এরমধ্যে গত ৮ সেপ্টেম্বর তিতাসের নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের কার্যালয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান তিতাসের জেনারেল ম্যানেজার আবদুল ওয়াহাব তালুকদারের নেতৃত্বে মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুল গফুরসহ চার জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
কমিটি জানায়, তদন্ত করে মসজিদের আশপাশে তারা পাইপ লাইনে ৬টি লিকেজ পেয়েছেন। এছাড়া মসজিদটি নির্মাণের সময় মসজিদের কমিটি রাজউক, তিতাস, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কোনও দফতরের অনুমোদন নেয়নি। তারা নিজেদের ইচ্ছামাফিক মসজিদ নির্মাণ করেছেন। এদিকে তিতাসের পাশাপাশি তদন্ত কমিটি করেছিল ডিপিডিসি। তারা তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মসজিদে দুটি বিদ্যুতের লাইন রয়েছে, যার একটি অবৈধ। তিতাস বলছে, ওই মসজিদে এসি থাকায় সব জানালা দরজা বন্ধ ছিল। গ্যাসের লিকেজ থেকে অল্প অল্প করে মসজিদের ভেতরে গ্যাস জমতে থাকে। সেদিন এশার নামাজের সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর মসজিদের মুয়াজ্জিন একটি লাইনে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় আরেকটি বিদ্যুতের লাইন চালু করতে গেলে সুইচে বিদ্যুৎ স্পার্ক করে। এতে মসজিদের ভেতরে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। মসজিদটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় আগুন লেগে যায় মসজিদের প্রায় প্রতিটি কোনায়। এ কারণেই হতাহতের হার অনেক বেশি হয়েছে। প্রতিবেদনে সুপারিশ হিসেবে বলা হয়েছে, এখন থেকে তিতাসের পাইপ লাইনের ওপর কোনও ধরনের স্থাপনা করা যাবে না। কারণ, এতে গ্যাসের পাইপ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে লিকেজ হতে পারে। আর লিকেজের সমস্যা পেলে সঙ্গে সঙ্গে যেন তিতাসকে জানানো হয়। এদিকে এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে তিতাসকে দায়ী করা হলে গত ৭ সেপ্টেম্বর তিতাস গ্যাসের ফতুল্লা অফিসের চার জন কর্মকর্তা এবং চার জন কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার তাদের বিষয়েও সিদ্ধান্ত জানাবে তিতাস।

ভাগ