যশোরে ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া তিন সাইবার প্রতারক র‌্যাবের হাতে আটক

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ‘করোনা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ২৫শ’ টাকা করে দিচ্ছেন’ এ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের পেইজে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যশোরের একটি প্রতারকচক্র। খুলনার লবণচরার র‌্যাব-৬ এর স্পেশাল কোম্পানির একটি টিম যশোরে পৃথক অভিযান চালিয়ে এই চক্রের ৩ সদস্যকে আটক করেছে। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে যশোর কোতয়ালি থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। শুক্রবার আটক ওই ৩ প্রতারককে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
আটক প্রতারকরা হচ্ছেন-সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের হামিদপুর দক্ষিণপাড়ার আনোয়ার হোসেনের ছেলে শাহরিয়ার আজম আকাশ (২০), পশ্চিমপাড়ার আব্দুল লতিফের ছেলে আহসান কীবর রনি (২০) ও চাঁদপাড়ার মশিয়ার রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান (২১)।
র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, সাইবার অপরাধ দলের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায় যে, যশোরে কতিপয় সাইবার প্রতারকচক্র ওয়েবসাইট ব্যবহার করে নিরীহ লোকজনের বিকাশ নম্বর ব্যবহার করে দারাজ নামে একটি অনলাইন শপ থেকে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে খুলনার লবণচরাস্থ র‌্যাব-৬ এর স্পেশাল কোম্পানির পুলিশ ইনসপেক্টর ডিএডি মো. আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে একটি টিম গত বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে শার্শা উপজেলার গোগা গাজীপাড়ায় অভিযান চালায়। এ সময় সেখান থেকে প্রতারকচক্রের সদস্য শাহরিয়ার আজম আকাশকে একটি মোটরসাইকেলসহ আটক করেন র‌্যাব সদস্যরা। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাহরিয়ার আজম আকাশ স্বীকার করেন যে, তারা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে নিরীহ লোকজনের বিকাশ নম্বর থেকে দারাজ ডটকম অনলাইন শপ থেকে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ের নামে লাখ লাখ হাতিয়ে নিচ্ছেন। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টার দিকে সদর উপজেলার হামিদপুর দক্ষিণপাড়ায় ওই প্রতারকের ঘরে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় সেখান থেকে একটি এইচপি ল্যাপটপ, একটি মনিটর, দুটি মোবাইল ফোনসেট ও একটি মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো-ল-২৯-৯৫২৫) জব্দ করা হয়। এরপর শাহরিয়ার আজম আকাশের স্বীকারোক্তিতে সকাল সোয়া সাতটার দিকে চাঁদপাড়ায় অভিযান চালিয়ে তার সহযোগী প্রতারক মুশফিকুর রহমানকে আটক করেন র‌্যাব সদস্যরা। এ সময় তার কাছ থেকে দুটি আইফোন ও একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। এরপর হামিদপুর পশ্চিমপাড়ায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় আরেক প্রতারক আহসান কবীর রনিকে। তার কাছ থেকে এ সময় একটি মোবাইল ফোনসেট ও একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়।
সূত্র জানায়, আটক প্রতারকদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় তারা অনেক আগে ওয়েব ডিজানিয়ংয়ের কাজ করতেন। কিছুদিন তারা বিভিন্ন ওয়েবসাইট নিয়ে কাজ করার পর মুভি/সিনেমা ডাউনলোড করার একটি ওয়েবসাইট ডিজাইন তৈরি করেন। সেখানে গ্রাহকদের ইউসি ব্রাউসার প্রমোট করে ডাউনলোড করানো এবং অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেওয়ার মাধ্যমে তারা অর্থ উপার্জন করতেন। পরবর্তীতে ইউসি ব্রাউসারের মালিকানা পরিবর্তন হওয়ায় তারা ফেসবুকে নিজস্ব পেইজ প্রমোট করা শুরু করেন। এরপর তারা বুঝতে পারেন প্রমোটিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের দৈনিক টাকা উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে খুব তাড়াতাড়ি পেইজের লাইক বাড়ানো যায়। তারা একথাও বুঝতে পারেন যে, পেইজ প্রমোটিংয়ের সময় গ্রাহকদের বোকা বানিয়ে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য খুব সহজেই সংগ্রহ করা যায়। এই বিষয়টি থেকে ফেসবুকে বিনামূল্যে ৫শ’ টাকা পাওয়া যাবে এমন একটি পোস্ট দেখে তারা বিকাশের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। প্রতারকদের মধ্যে শাহরিয়ার আজম আকাশ তার দারাজ ডটকমে রেজিস্ট্রেশন করা সেলার অ্যাকাউন্ট থেকে ফ্রি ফায়ার নামের একটি অনলাইন ভিত্তিক গেইম এর ফি কারেন্সি ডাইমন্ড বিক্রি শুরু করেন। ২৮ হাজার টাকা বিক্রি হলে ওই টাকা দারাজ ডটকম তার দেয়া অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করে। এরপর প্রতারকরা তাদের আগেই ক্রয় করা ডোমেইন ব্যবহার করে একটি প্রতারণামূলক ওয়েবসাইট ডিজাইন তৈরি করেন। যার ডোমেইন নাম ‘২৫০০টাকা ডট অনলাইন’। সেখানে তারা মাঝে মধ্যে ডোমেইন নাম পরিবর্তন করতেন যাতে পেইজ প্রমোটিংয়ের সময় এই প্রতারণা সহজে কেউ শনাক্ত করতে না পারে। ‘২৫০০টাকা ডট অনলাইন’ এ প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত করোনা পরিস্থিতিতে দরিদ্রদের মাঝে ২৫শ’ টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রেরণ করা হবে এমন ঘোষণার মতো মহতি উদ্যোগকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ওই প্রতারকরা ফাঁদ পাতেন। এ জন্য তাদের পেইজে বলা হয়, করোনা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২৫শ’ টাকা বিকাশে দেয়া হচ্ছে। যার জন্য ফরম পূরণ করতে হবে। ওই ফরমের তথ্যের মধ্যে নাম ঠিকানা ছাড়াও বিকাশ নম্বর ও পিন কোড দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এভাবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সাধারণ লোকজনের বিকাশ ও পিন কোড নম্বর সংগ্রহ করে নানা পন্থায় ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওই প্রতারকেরা।

ভাগ