তহীদ মনি ॥ যশোরের ক্রীড়াঙ্গন করোনায় থেমে গেছে। স্থবির হয়ে আছে সাঁতার, বক্সিং, বাস্কেটবল, ওয়াটার পোলোসহ দেশজয়ী এথলেটসদের পদচারণা। এক সাথে থেমে গেছে অনুশীলন ও আগামীদিনের সম্ভাবনা। ঘরে বসে থাকতে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন খেলোয়াড়রা। অনুশীলন না থাকায় ফিটনেসহীনতা যেমন তাদেরকে শংকিত করছে তেমনি আগামীদিনের উজ্জ্বল সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। নিয়মিত ক্রীড়া অনুশীলন ও প্রতিযোগিতা না থাকায় অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এইসব খেলার সাথে যুক্ত প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা।
যশোরে সাঁতারের ঐতিহ্যের কথা এ অঞ্চলের মানুষসহ দেশের ক্রীড়ামোদিরা ভালোভাবে জানেন। এখানকার খেলোয়াড় দেশসেরা সাঁতারু মাহফুজ খাতুন শীলা ১২তম এসএ গেমস এ ২টি স্বর্ণপদক জয় করেছেন। এছাড়া জাতীয় দলের খেলোয়াড় ’৯১-এ সাফ গেমসে ব্রোঞ্জ জয়ী সাঁতারু রেশমা পারভীন দীপু (বাংলাদেশের ১ম মহিলা সাঁতারু,) একই গেমসে অংশ নেয়া রুবিনা জেসমিন পল্লবী, ’৯৫ মাদ্রাজ সাফ গেমসে অংশ নেয়া সাঁতারু জোবেদা খানম ইতি, সাফ গেমস ও ইন্দো বাংলা গেমসএ অংশগ্রহণকারী নজরুলরা এই যশোরের ক্রীড়াঙ্গন থেকে উঠে আসা জাতীয় দলের সেনা বিমান, নৌ, আনসার বাহিনীসহ বিভিন্ন দলের হয়ে খেলে সুনাম ও পদক জয় করেছেন। তাদের পদানুসরণ করে যশোরের সাতটি সুইমিং কাবের ৯ জন প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নারী-পুরুষসহ ৪৫/৫০ জন সাঁতারু নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন কাবে ও জাতীয় দলের হয়েও খেলেছেন অনেকে। যশোর মিতালী সংঘ, ডলফিন সুইমিং কাব, যশোর সুইমিং কাব, থ্রি ব্রাদার্স, সুইমিং কাব, বৈশাখী বাণিজ্য সংস্থা, সৃষ্টি সুইমিং কাব ও ইস্ট বেঙ্গল সুইমিং কাব নামের এসব সংগঠন দেশসেরা সাঁতারু উপহার দেয়ার পাশাপাশি শতাধিক ওয়াটার পোলো খেলোয়াড়ও তৈরি করেছে। এসব খেলোয়াড় থেকে উপযুক্তদের নিয়ে তৈরি জেলা ওয়াটারপোলো দল ২০১২ ও ২০১৪ সালের জাতীয় প্রতিযোগিতা দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এই সাঁতারেই যশোর থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাঁতারের বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের সহসভাপতি ও ডলফিন কাবের প্রশিক্ষক মোহাম্মাদ আব্দুল মান্নান। ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাঁতারে যশোরের রয়েছে বিশেষ সুনাম। শুধু সাঁতার বা ওয়াটার পোলোতে নয় বক্সিং, অ্যাথলেটস, বাস্কেটবল, হ্যান্ডবলেও যশোরের সুনাম রয়েছে দীর্ঘদিন। জাতীয় দলের অনেক স্বনামধন্য খেলোয়াড় যশোর থেকেই মাঠ ও দর্শক মাতিয়ে ক্রীড়া নৈপূণ্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। আগামী দিনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সাঁতারে স্থান করে নেয়ার জন্য শীলা, দীপু, পল্লবী, ইতি, কেয়া, সোনালীরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে বিশ্বব্যাপী করোনার ভয়াল থাবায় অন্যসব সেক্টরের মতো এ জাতীয় অপ্রচলিত খেলার আঙ্গিনা কল-কোলাহল থেমে গেছে। সাঁতারু কেয়া, সোনালী, অ্যাথলেট প্রশিক্ষক তৌহিদুর রহমান নিবাস হালদার সাঁতার প্রশিক্ষক মোহাম্মাদ আব্দুল মান্নান, নুরুল আরেফিনদের মতে এ জাতীয় খেলার দুই ২/১ জনকে আলাদা আলাদা করেও প্রশিক্ষণ অব্যহৃত রাখা হয়। পানিতে করোনা ছড়ায় না বলে তারা জেনেছেন, এসব ক্ষেত্রে সাঁতার, ওয়াটার পোলোর মতো খেলা অনুশীলনের অনুমতি থাকা দরকার। এর সাথে শরীরের ফিটনেস জড়িত যা অনুশীলন ছাড়া সম্ভব নয়। আবার ভালোমানের খেলোয়াড় তৈরি হলে তারা যেমন জেলা ও দেশের সমাজে পরিণত হন তেমনি সাফল্য তাদের চাকরিসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পথ করে দেয়। এতে তারা আর্থিকভাবেও স্বাবলম্বী হতে পারে। দীর্ঘদিন মাঠে না থাকা, অনুশীলন না থাকা, প্রতিযোগিতা না থাকায় খেলোয়াড়দের ফিটনেস হারাচ্ছে এবং মানসিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও অভিমত প্রশিক্ষক আব্দুল মান্নানের। প্রতিযোগিতা না থাকায় জাতীয় দল সহ বিভিন্ন দল যে, চাকরির সুযোগ থাকে সেটাও এখন থাকছে না তাই আথিকভাবেও খেলোয়াড়রাও তাদের পরিবার মারাত্মক সংকটে রয়েছেন বলে জানান নিবাস হালদার। এ প্রসঙ্গে প্রশিক্ষক তৌহিদুর রহমান আকরাম হোসেনের লং জাম্ফ ও স্বর্ণজয় শর্টফুটে ৩ বার গোল্ড মেডেল জয়ী মুক্তা খাতুন, ১১০ মিটার হার্ডল-এ গোল্ড মেডেলিস্ট ত্বোহাসহ বিভিন্ন খেলোয়াড়দের অর্জন উল্লেখ করে বলেন, এইসব দেশ সেরা ক্রীড়াবিদরা অচিরেই তাদের দক্ষতা হারিয়ে ফেলতে পারেন এখনই যদি অন্তত: তাদের অনুশীলন ফেরানো না যায়। এ প্রসঙ্গে যশোরের বক্সিং-এ সফলতা তুলে ধরে বক্সিং কোচ ফজলু বলেন, দেশের ৬০-৭০ শতাংশ বক্সারই যশোর থেকেই জাতীয় দলে। সার্বক্ষণিক অনুশীলন ও তত্ত্বাবধায়ন ছাড়া এইসব খেলোয়াড়দের সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভাবনা আর ফিটনেস না থাকলে আগামী স্বপ্ন দেখাও দু:সাধ্য হয়ে পড়বে। সাতারু কেয়া জানান আমাদের সমাজ থেকে একজন ঘরের আঙিনা ছেড়ে খেলার মাঠে যোগ্য হতে অনেক অনেক চেষ্টা ও সাধনা দরকার জেলা ও জাতীয় দল থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছাতেও দরকার অনেক কিছু ত্যাগ করে সামনে যেতে হয়। এতটা পথ আসতে অর্থনৈতিকভাবেও মোতাবেলা করতে হয় নানা বাধা। এত কিছুর পর এতটা পথ এসে করোনার কারণে থেমে যেতে হচ্ছে এটা দু:খজনক। একবার মাঠ থেকে হারিয়ে গেলেও আবার সেই জায়গায় ফেরা খুবই কঠিন। তাই অন্তত: অনুশীলনের সুযোগ চান তিনিসহ সবাই। তাদের বিশ্বাস সরকার স্বাস্থ্যবিধিসহ খেলোয়াড়দের মাঠে ফেরার অনুমতি দেবে শীঘ্রীই।



