কবে খুলবে টিউশনির দুয়ার

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আবির আহমেদ। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। তার বড় ভাই প্রবাসে আর দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আবির টিউশনি করে কোনোরকম চালিয়ে নিচ্ছিলেন নিজের খরচ। বড় ভাই কাতারে যাওয়ার আগে আবাদি জমি বন্ধক রেখে যান। ভাইয়ের পাঠানো টাকা দিয়ে কোনোরকম চলছিল বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সংসার। আবির বলেন, বন্ধ টিউশনি। বাধ্য হয়ে বাড়িতে ফিরেছি। করোনার প্রভাবে তার ভাইয়েরও আয় কমে গেছে। আগে প্রতি মাসে বাড়িতে পাঠাতেন ৪০ হাজার টাকা। এখন পাঠাচ্ছেন প্রায় অর্ধেক। আব্বা-আম্মার ওষুধের পিছনে প্রতিমাসে খরচ হয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া দিতে হয় চার হাজার টাকা। আমি আর পারছি না। এভাবে বাড়িতে বসে থাকতে খুব অসহায় লাগে। কবে খুলবে টিউশনি?
টিউশন ফি’র অভাবে সেমিস্টার চালিয়ে নিতে পারছেন না তাসনিম মৌরি জয়া। শিক্ষক বাবার সন্তান তিনি। অদম্য জয়ার পথচলা থেমে গেছে করোনার প্রভাবে। থমকে আছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য উদ্যোক্তা হওয়ার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার পরেও মনমতো বিষয় না পাওয়ায় সাহস করে ভর্তি হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। টিউশনি করেই চলছিল তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। করোনার প্রভাবে বন্ধ টিউশনি, বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। রাজধানীতে মেস ছেড়ে দিয়ে দিনাজপুরে আছেন জয়া। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম করে বড় হয়েছি। আগে টিউশনি করিয়ে মাসে আয় করতাম ১৮ হাজার টাকা। নিজের খরচটা খুব ভালোভাবেই চলে যেতো। এমনকি বাড়িতেও টাকা পাঠাতাম। এরপর বন্ধ হয়ে গেল টিউশনি। এর আগের সেমিস্টার শেষ করতে পারলেও টিউশন ফি বাকি থাকায় এবারের সেমিস্টার আর করতে পারিনি।
রংপুর কারমাইকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমানুল ইসলাম। দু’বছর আগে চার মাসের মাথায় মৃত্যু হয় বাবা-মায়ের। পারিবারিকভাবে সে বছরই বাধ্য হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। আট ভাই-বোনের সবার ছোট তিনি। লেখাপড়া রংপুরে হলেও টিউশনির জন্য থাকতেন রাজধানীতে। তার স্ত্রী গর্ভবতী। করোনার সময়ে টিউশনি হারিয়ে বাড়িতে বসে আছেন। এমন সময়েই গর্ভবতী হন তার স্ত্রী। ইমানুল ইসলাম বলেন, আমার স্ত্রীও শিক্ষার্থী। সে রংপুর সরকারি কলেজের অনার্সের শিক্ষার্থী। যদিও বাবা হতে চলেছি আল্‌হামদুলিল্লাহ্‌। কিন্তু এখন সন্তান নেয়ার পরিকল্পনা ছিল না। এমনি এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি ওকে যে একটু চিকিৎসা দেবো সেই টাকাও নাই। একটু ভালো-মন্দ খাওয়াবো তারও উপায় নেই।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসিফ হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বাড়িতে বসে আছি। হাতে টাকা নেই, খুবই অস্বস্তিকর অবস্থায় দিন কাটছে। বাবার আয়ে পুরো পরিবার চলে। আবার গ্রামে থেকে পড়াশোনার খুবই ক্ষতি হচ্ছে। পারছি না বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে। এমনি অবস্থা হয়েছে যে চাইলেও মোবাইলে রিচার্জ পর্যন্ত করতে পারছি না। টিউশন বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন টিউশন মিডিয়া হাউজগুলোও। টিউটর দিচ্ছি-নিচ্ছি ও ঢাকা টিউশন মিডিয়ায় স্বত্বাধিকারী চৈতি দেবনাথ বলেন, আমার দুই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০টি টিউশনির ব্যবস্থা করে দিতাম। এখন টিউশনি নেই বন্ধ আমাদের প্রতিষ্ঠান। লালমাটিয়ায় আমাদের অফিসটা পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছে। প্রাণঘাতী করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরই প্রভাবে বন্ধ টিউশনি। শিক্ষার্থীদের প্রাণশক্তিখ্যাত টিউশনি বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন লাখো শিক্ষার্থী। একইভাবে বিপদে পড়েছেন ইমাম-মুয়াজ্জিনরাও। তারা বিভিন্ন বাসায় গিয়ে কোরআন শিক্ষা দিয়ে থাকেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর এক মুয়াজ্জিন বলেন, আগে তিনটি বাড়িতে পাঁচজন বাচ্চাকে পবিত্র কোরআন শরীফ পড়িয়ে আয় করতাম ছয় হাজার টাকা। মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়িয়ে যে আয় হয় তা দিয়ে চললেও এই টাকাটা আমার জন্য ছিল সম্বল। তা হারিয়ে বেশ সমস্যার মুখেই পড়েছি।
করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে বিশ্ব। সেই দৌড়ে রয়েছে বাংলাদেশও। করোনার প্রভাবে নতুনত্ব এসেছে টিউশনিতে। সম্প্রতি বেশকিছু শিক্ষক অনলাইনে করাচ্ছেন টিউশনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিব হাসান তাদের একজন। রাকিব বলেন, টিউশনি বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি যোগাযোগ করতো। তাদের নানা সমস্যার সমাধান করে দিতে থাকি। এরপর এক অভিভাবক বললেন, তুমি একটা নির্দিষ্ট সময় করে ওকে ভিডিও কলে পড়াও। এই থেকেই চিন্তাটা মাথায় আসে। এখন আমি চারটি টিউশনি অনলাইনে করাই। এছাড়াও রাজধানীতে বাড়িতে এখন টিউটররা আসতে শুরু করেছেন। রাজধানীর গুলশানের এক বাড়ির নির্দেশনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। নির্দেশনায় দেখা যায়, একজন টিউটর এক ফ্ল্যাটেই যেতে পারবেন। সপ্তাহে চারদিনের বেশি আসতে পারবেন না। এছাড়াও নিরাপত্তার জন্য মাস্ক, সেনিটাইজার ইত্যাদি সুচারুভাবে পালন করতে হবে। সেই বাড়ির কেয়ারটেকার নিতাই চন্দ্র বলেন, এখানে ছয়তলা করে দু’টি বাড়ি। ফ্ল্যাট রয়েছে ৪২টি। আগে স্কুল থাকা অবস্থায় শিক্ষক আসতেন প্রায় ৫০ জন। করোনার প্রভাবেতো কোনো শিক্ষকই আসতেন না। তবে এখন আসেন আট জন শিক্ষক।

ভাগ