১২ গুরুত্বপূর্ণ ধাপেই ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফলতা

    লোকসমাজ ডেস্ক॥প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক বিশ্বে ফ্রিল্যান্সিং-এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অন্যান্য দেশের মতো ফ্রিল্যান্সিং-এর জনপ্রিয়তা বাংলাদেশেও ঊর্ধ্বমুখী। এরইমধ্যে বাংলাদেশে নথিভুক্ত ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন ছয় লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে নিয়মিত কাজ করেন পাঁচ লাখ ফ্রিল্যান্সার। তাদের বার্ষিক আয় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফ্রিল্যান্সিং-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আপনি নিজেই আপনার বস্। আপনি কাজের সময় নির্ধারণের স্বাধীনতা পাবেন। নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাজ বেছে নিতে পারবেন। তবে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করা কী সহজ? একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিজেকে সফল করতে হলে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অনুসরণ করতে হবে।
    নিজেকে সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গড়ে তোলার ১২টি ধাপ তুলে ধরা হলো:-
    ১. নিজের দক্ষতা চিহ্নিতকরণ
    ফ্রিল্যান্সিং-এর প্রথম ধাপ হচ্ছে ধৈর্য ধরে শেখা, শেখাকে কাজে লাগানো। পাশপাশি নিজের দক্ষতাগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং-এ দক্ষতাই আপনার পুঁজি। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতাই সফলতা এনে দিতে ভূমিকা রাখবে। যেসব ক্ষেত্রগুলোতে ফ্রিল্যান্সারদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি:-
    * গ্রাফিক ডিজাইনিং
    * ওয়েব ডেভেপলপমেন্ট
    * অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট
    * কনটেন্ট রাইটিং
    * অনুবাদ
    * ভার্চুয়াল অ্যাসিসট্যান্স
    * ডেটা এন্ট্রি
    * অ্যাকাউন্টিং ও ফিন্যান্স সাপোর্ট
    * প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও স্ক্রিপ্ট লেখা
    * ভিডিও এডিটিং
    উল্লিখিত ক্ষেত্রে দক্ষতা থাকলে সব ধরনের প্রকল্পে কাজ শুরু করুন। তবে সবক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। যেসব ক্ষেত্রে আপনার দক্ষতা বেশি, সেসব ক্ষেত্রে কাজ করুন।
    ২. বাজার উপলব্ধি করুন
    বাজারের চাহিদা মেটানোর দক্ষতা থাকলেই আপনি আয় করতে পারবেন। তাই দক্ষতার ক্ষেত্রটি চিহ্নিত করুন। এছাড়া আপনার দক্ষতা অনুযায়ী বাজারে কাজ রয়েছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করুন। কারণ ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষতার ভিত্তিতে কোম্পানি, এজেন্সি বা লোক নিয়োগ দেয়। মনে রাখবেন, নির্দিষ্ট কাজে আপনি যতই দক্ষ হোন, বাজারে চাহিদা না থাকলে এ দক্ষতা থেকে আয় সম্ভব নয়। সুতরাং বাজার বুঝে দক্ষতা বাড়ান। এতে উন্নতির ধাপ সহজ হবে।
    ৩. প্রয়োজনে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নিন
    দক্ষতার ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করার পর বাজার বুঝে দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করুন। বিভিন্ন প্রজেক্ট দেখে বোঝার চেষ্টা করুন। আপনার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এসব প্রজেক্ট সম্পন্ন করার জন্য যথেষ্ট কি না? যদি মনে করেন, আপনার আরো ফ্রিল্যান্সিং-এর দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন তবে সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ নিন। এক্ষেত্রে অনলাইন কোর্স বা কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। মনে রাখতে হবে, নামি প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা আপনার সিভির মূল্যায়ন বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ফ্রিল্যান্সিং ইউটিউব বা ইউডেমির মতো প্ল্যাটফর্মে থাকা ভিডিও দেখে নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারেন।
    ৪. পোর্টফোলিও তৈরি করুন
    যেকোনো ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে একটি ঝকঝকে ও তথ্য সমৃদ্ধ পোর্টফোলিও জরুরি। পোর্টফোলিও-তে আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত দেয়ার পাশাপাশি কাজের অভিজ্ঞতা ও নমুনাও তুলে ধরুন। এ পোর্টফোলিও নিয়মিত আপডেট করে নতুন উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা যুক্ত করুন।
    আজকাল উইক্স, উইব্লি ইত্যাদি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিনামূল্যে ও সহজেই ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়। শুরুর দিকে নিজের ওয়েবসাইট শুরু করার মতো যথেষ্ট উপাদান হাতে নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে খানিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর ওয়েবসাইট তৈরির কথা ভাবুন।
    ৫. পরিষেবার মূল্য নির্ধারণ করুন
    ফ্রিল্যান্সিং-এর ক্যারিয়ারে পারিশ্রমিক নির্ধারণের সম্পূর্ণ এখতিয়ার আপনার উপর। তবে বাজার ও নিজের কাজের গুণগত মান বিবেচনায় রেখে পরিষেবার মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। আপনাকে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, শুরুতেই আপনি খুব বেশি মূল্য রাখতে পারবেন না। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিষেবা মূল্যও বাড়বে। আবার অনভিজ্ঞ বলে অন্যায্য মূল্য মেনে নেয়া উচিৎ নয়। এতে আপনি ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক বাজারের মানও ধসে পড়তে পারে।
    ৬. অনলাইন মার্কেটপ্লেসে নাম নথিভুক্ত করুন
    ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করার একটি সহজ ও কার্যকরী উপায় হলো অনলাইন মার্কেটপ্লেসে প্রোফাইল তৈরি করা। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলো ফ্রিল্যান্সার ও ক্লায়েন্টের মধ্যে ব্যবসায়ীক বন্ধন সৃষ্টি করে। ক্লায়েন্ট তার চাহিদার বিবরণ দিয়ে মার্কেটপ্লেসে পোস্ট করেন বা ফ্রিল্যান্সারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন।
    সাধারণত মার্কেটপ্লেস ওয়েবসাইটগুলোতে ফ্রিল্যান্সিং একাউন্ট খুলতে বা ফ্রিল্যান্সিং প্রোফাইল তৈরি করতে টাকা লাগে না। এসব প্ল্যাটফর্ম কাজ পেলে পারিশ্রমিকের একটা অংশ কেটে নেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই যাবতীয় টাকার লেনদেন হয়। এতে কাজের পর টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তাও থাকে। যেহেতু মার্কেটপ্লেস প্ল্যাটফর্মগুলো পারিশ্রমিকের একটা অংশ কেটে নেয় সেহেতু দীর্ঘ দিন শুধুমাত্র এই ওয়েবসাইটগুলোর ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
    ৭. বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে কাজ করুন
    দেশ-বিদেশে বিভিন্ন এজেন্সি রয়েছে। এজেন্সিগুলো নিয়মিতভাবে ফ্রিল্যান্সারদের সঙ্গে কাজ করে থাকে। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই কাজ করে এজেন্সিগুলো। একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে এজেন্সিগুলো চিহ্নিত করে আবেদন পাঠাতে থাকুন।
    সাধারণত এজেন্সির ওয়েবসাইটের নিচে আবেদন করার ঠিকানা দেয়া থাকে। আপনার দক্ষতা এজেন্সির চাহিদার সঙ্গে মিলে গেলে তাদের ডেটাবেজ-এ রেখে দেবে। আপনার দক্ষতা অনুযায়ী কোনো কাজ এলে এসব এজেন্সির লোক আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তবে মনে রাখতে হবে, নাম নথিভুক্তির অনেকদিন পরও এজেন্সি থেকে কোনো কাজ নাও পেতে পারেন।
    বড় এজেন্সিরা সাধারণত প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফিল্যান্সারের নাম নিজেদের ডেটাবেজে রাখে। হঠাৎ প্রয়োজনীয়তা বাড়লে নিজেদের ডেটাবেস থেকে উপযুক্ত ফ্রিল্যান্সারকে খুঁজে নিতে পারে তারা।
    একবার কাজের দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারলেই আরো কাজ পাওয়ার সুযোগ বেড়ে যাবে। এজেন্সির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হলেই নিয়মিত কাজ আসতে পারে।
    তবে এজেন্সির সঙ্গে কাজ করার আগে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে অনলাইনে ভাল করে গবেষণা করুন। বর্তমানে বহু প্রতারক এজেন্সি রয়েছে যারা কাজ সম্পন্ন করার পর পারিশ্রমিক নিয়ে উধাও হয়ে যায়।
    ৮. সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করুন
    অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং সাইট বা এজেন্সির সঙ্গে কাজ করুন। তবে সব সময়েই গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার চেষ্টায় থাকুন। প্রথমেই সরাসরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো কঠিন। তবে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে কাজের চেষ্টা করা উচিত। এতে আয় বাড়ার পাশাপাশি খ্যাতিও বাড়বে। কাজে সন্তুষ্ট হলে গ্রাহকের মুখে মুখে প্রচারেই নতুন গ্রাহক মিলবে।
    এছাড়া গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি কাজ করুন। কারণ এতে কাজের মান বাড়ানো সহজ হয়। আপনি নিজে কথা বলে গ্রাহকের প্রয়োজন ও পছন্দ বুঝে নিন। সেই অনুযায়ী নিজের কাজের ধরনও বদলাতে পারেন। এছাড়া গ্রাহকের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ও সম্পর্ক তৈরি হলে ভবিষ্যতে কাজ পেতে সহজ হবে।
    ৯. দেশের বাইরে গ্রাহক পাওয়ার চেষ্টা করুন
    উন্নয়নশীল দেশে ফ্রিল্যান্সিং করার একটা বড় সুবিধা হলো বিদেশের বাজারে কাজ করে ভালো আয় করা যায়। উন্নয়নশীল দেশে জীবনধারণের খরচ প্রথম বিশ্বের যেকোনো দেশের থেকে অনেক কম। ফলে আপনি দেশে বসে বিদেশি গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করে আয় করতে পারেন। এতে বড় অংকের টাকা পাওয়া যায়। অনেক সময় বিদেশি গ্রাহকরাও নানা দেশ থেকে ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ করতে উদ্যোগী হন। কারণ উন্নত দেশের কর্মীদের তুলনায় অনেক কম টাকায় উন্নয়নশীল দেশের দক্ষ কর্মী পাওয়া যায়।
    ইউএসএ, অস্ট্রেলিয়া ও ইউকে থেকে সবচেয়ে বেশি ফ্রিল্যান্সের কাজের সুযোগ আসে। অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং জব সাইটগুলোতে বিদেশি গ্রাহক পেতে উপযুক্ত দক্ষতা দেখাতে হবে। একবার উভয় পক্ষের মধ্যে বিশ্বস্ততা তৈরি হলেই সেই গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগও আপনি পেতে পারেন।
    ১০. সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী হলেই আবেদন করুন
    কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজেক্টে আবেদন করার আগে খুঁটিয়ে দেখুন। প্রজেক্টের সম্পূর্ণ কাজটি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করার সক্ষমতা যাচাই করুন। ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হলেই সেই কাজের জন্য আবেদন করুন। সেটি অনলাইন ফ্রিল্যান্স সাইট বা এজেন্সি অথবা সরাসরি গ্রাহক হতে পারেন। কোনো কাজ মাঝ পথে ছেড়ে দিলে বা সঠিকভাবে শেষ না হলে ক্যারিয়ারে খারাপ প্রভাব পড়বে।
    ১১. অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের ব্যবস্থা করুন
    বর্তমানে ফ্রিল্যান্স ব্যবসার যাবতীয় লেনদেনের অধিকাংশই অনলাইনে হয়। অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ সব সময়ই সুরক্ষিত ও সুবিধাজনক। পেপ্যাল, পেয়োনিয়ারসহ একাধিক জায়গায় অ্যাকাউন্ট খুলুন। বিশেষত বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে লেনদেনের জন্য এটি থাকা আবশ্যক।
    ১২. কাজের সময়সূচি তৈরি করুন
    ফ্রিল্যান্সিং-এ কোনো বাধা ধরা সময়সূচি নেই। আপনি নিজেই আপনার রুটিন তৈরি করতে পারেন। কাজের চাপে সময়সূচির এদিক ওদিক হতেই পারে। কিন্তু একটি কাজ সময়ের মধ্যে শেষ করতে সঠিক পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
    একটি প্রজেক্ট শেষ করতে আপনার কতটা সময় লাগবে তা প্রথমেই ঠিক করে নিন। সেই হিসেবে ডেডলাইন নির্ধারণ করুন। আবার নতুন কাজ নেয়ার সময় আগে নেয়া কাজ শেষ করার তারিখ মনে রাখতে হবে।
    আপনার সাধ্যের বাইরে কাজ নিতে যাবেন না। অনেক সময় লোভনীয় ও লাভজনক সুযোগ ছাড়তে হবে। কিন্তু হতাশ না হয়ে সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করুন। সঠিক সময়ে পরিষেবা হস্তান্তর আপনার ক্যারিয়ারে সফলতা এনে দেবে।
    ফ্রিল্যান্সার হিসেবে সফলতার মূল চাবিকাঠি হচ্ছে দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও আত্মবিশ্বাস। আপনার দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে আপনার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার এগিয়ে যাবে। এখানে আপনার কোনো বস নেই, তেমনি কাজ শিখিয়ে দেয়ার কেউ নেই। আপনাকে ধৈর্য সহকারে কাজ করে উন্নতি লাভ করতে হবে। ধৈর্য ও অধ্যবসায় রাখলেই ১০০ শতাংশ পেশাদারিত্ব বজায় রাখা সম্ভব।

    ভাগ