বাড়ছে ফ্ল্যাট বিক্রি

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ সাম্প্রতিক করোনাকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের সব খাতের মতোই দেশের আবাসনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে আলোচ্য সময়ে নানামুখী সুবিধা ঘোষণা দেয়ায় করোনাভাইরাসের ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে খাতটি। সুবিধাগুলোর মধ্যে এক অঙ্ক বা সিঙ্গেল ডিজিটের ঋণ সুবিধা, অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ সুবিধা ও রেজিস্ট্রেশন খরচ কমায় ক্রেতাদের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ক্রেতারা ফ্ল্যাটের খোঁজখবর নিচ্ছেন। ফলে অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠানের ফ্ল্যাট বিক্রি বেড়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, করোনার আগে এ প্রতিষ্ঠানে বিক্রি যে পরিমাণ ছিল, গত দেড় মাসে তার কাছাকাছি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। তবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ২০-৩০ শতাংশ কম। বিক্রি শুরু হওয়ায় নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো। এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজেটে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা (অপ্রদর্শিত অর্থ) বিনিয়োগের সুবিধা দেয়ায় করোনাকালের মধ্যেই ফ্ল্যাট বিক্রিতে গতি এসেছে।
ব্যাংক ঋণে সুদের হার হ্রাস পাওয়ার কারণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এক্ষেত্রে তাদের সাহস জোগাচ্ছে এটি। উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার পাশাপাশি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও রয়েছে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, অপ্রদর্শিত আয়ের অর্থ বিনাশর্তে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেয়ার কারণে আশা করি, করোনার মধ্যেই আবাসন খাত চাঙ্গা হবে। শুধু এই খাত নয়, পুরো অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখন অনেক ক্রেতা ও উদ্যোক্তা জানতে চান- কীভাবে অপ্রদর্শিত আয় ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাজেটের সুবিধাসমূহ তুলে ধরছি। আশার কথা হলো- চলতি ২০২০-২১ অর্থবছর শুরু হওয়ার পর ইতিমধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ আবাসন খাতে এসেছে। ফলে চলমান করোনা মহামারিতে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে এগোচ্ছে আবাসন খাত। রিহ্যাব সভাপতি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে আবাসন প্রকল্পে কাজের গতি কমেছে। ফলে সময় বাড়ছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, আবাসন খাত চাঙ্গা হওয়ার সঙ্গে জড়িত রড, সিমেন্ট, ইট, বালুসহ ২১১টি নির্মাণ উপখাতের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে। এতে করে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে। এর আগে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগটি দেয়া হয়েছিল। তখন আবাসন খাতে প্রচুর বিনিয়োগ আসায় এই খাত চাঙ্গা হয়েছিল। এবারও আশা করা হচ্ছে, আবাসন খাতে এর সুফল মিলবে।
দেশে গত ৮ই মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তারপর মার্চের শেষদিকে করোনা সংক্রমণ রোধে দেশজুড়ে লকডাউন বা অবরুদ্ধ অবস্থা জারি করা হয়। এতে আবাসন ব্যবসায় ভয়াবহ ধস নামে। ফলে প্রকল্পের নির্মাণকাজ ও ফ্ল্যাট বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছ থেকে কিস্তির টাকাও পায়নি প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে এখন কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছে। আবাসন খাতের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বিল্ডিং ফর ফিউচার লিমিটেড জানায়, তাদের ফ্ল্যাট বিক্রি বেড়েছে। অনেক ক্রেতা ফ্ল্যাট কেনার জন্য খোঁজখবর নিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীরুল হক বলেন, ফ্ল্যাট বিক্রি বৃদ্ধির পেছনে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। ফ্ল্যাট কেনার জন্য ক্রেতাদের মধ্যে অনেক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
জানা গেছে, ২০১২ সালে আবাসন খাতে মন্দা শুরু হয়। পরের বছর টানা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেটি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সে সময় ফ্ল্যাটের মূল্য কমিয়েও ক্রেতা খুঁজে পায়নি অনেক প্রতিষ্ঠান। কিস্তি দিতে না পারায় অনেক ফ্ল্যাটের ক্রেতা বুকিং বাতিলও করেছেন। সেই অস্থির সময় পার করে ২০১৬ সালের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও সংকট কাটেনি। তবে ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে সরকারি কর্মচারীদের ৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেয়ার ঘোষণা আসে। আবার গত বছর নিবন্ধন ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়। ফলে করোনার আগ পর্যন্ত আবাসন ব্যবসা ইতিবাচক ধারায় ছিল। শেল্টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, লকডাউন তুলে দেয়ার পর ফ্ল্যাট কেনার জন্য ক্রেতাদের মধ্যে অনেক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে শেল্টেকের ২৫-২৬টি নতুন প্রকল্প পাইপলাইনে রয়েছে।
প্রসঙ্গত, এতদিন শুধু ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে এই সুযোগ ছিল। এখন নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে জমি কেনাতেও এই সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রশ্ন করবে না। এছাড়া বাজেটে করপোরেট কর হার আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। এর একটা বাড়তি সুবিধা পাবে আবাসন খাত। এর বাইরে কাঁচামালের ওপর এক শতাংশ অগ্রিম কর কমানো হয়েছে। এর ফলে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য কমারও সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে আবাসন খাতের উৎপাদন খরচও কমে আসবে। একইসঙ্গে খাতটির সঙ্গে জড়িত ৩৫ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর একটা অংশের বেকার হওয়ার আশঙ্কা কাটবে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, তাও দূর হবে।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ১১ই জুন জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাজেটে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছেন। ফ্ল্যাট কিনে কালো টাকা সাদা করতে চাইলে গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশার বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং ধানমন্ডি, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের হাউজিং সোসাইটি (ডিওএইচএস), মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, নিকুঞ্জ, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা এবং চট্টগ্রামের খুলশী, আগ্রাবাদ, নাছিরাবাদে প্রতি বর্গমিটারে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কর দিতে হবে। এসব এলাকার বাইরে যেকোনো সিটি করপোরেশনে প্রতি বর্গমিটারে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কর দিতে হবে। সারা দেশে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ৩১শে মে থেকে ৩০শে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭৮০টি দলিল হয়েছে। এতে সরকারের মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৫২৯ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৩৯ টাকা। চলতি মাসে আগের চেয়ে বেড়েছে ঢাকা জেলার দলিলের সংখ্যা। গত ২৩শে জুলাই পর্যন্ত ১১ হাজার ১২১টি দলিল হয়েছে। গত মার্চ মাসে (২৫ তারিখ পর্যন্ত) ঢাকা জেলা থেকে ২২ হাজার ৬৭৪টি দলিলের সার্টিফায়েড কপি সরবরাহ করা হয়েছে। আর জুলাই মাসের ২৩ দিনে দেয়া হয়েছে ১৫ হাজার ৯১১টি।