স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরের বাঘারপাড়ায় খবির উর রহমান কলেজের শিক্ষক কর্মচারীরা আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের কোন্দলে অস্তিত সংকটে পড়েছে। কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতির বিরুদ্ধে একের পর এক অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ কলেজের অধ্যক্ষকে সাময়িক বহিষ্কারাদেশ দেওয়ায় সংকট আরও ঘণীভূত হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এই কলেজে অস্থিরতার সূত্রপাত চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে। পূর্নিমা রানী বিশ্বাস নামে কলেজের ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষককে কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী সাময়িক বহিষ্কার করার এক তরফা সিদ্ধান্ত নেন। ওই শিক্ষিকার স্বামী একই দলের বিবদমান অন্য গ্রুপের নেতা হওয়ায় প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে সভাপতি এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের চেষ্টা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। অনৈতিক এ কর্মকান্ডে অধ্যক্ষ শামসুর রহমান সমর্থন না করায় শেষমেষ অধ্যক্ষের প্রতিও চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী।
সভাপতির প্রতিহিংসার শিকার শিক্ষক পূর্নিমা দাসের স্বামী আজিজুর রহমান বলেন, তার সাথে কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারীর দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব চলে আসছে। বিগত উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী নাজমুল ইসলাম কাজলের পক্ষে কাজ করার কারণে তিনি আমাকে নানাভাবে হয়রানি করে আসছেন। আমাকে শায়েস্তা করতে শেষমেষ তিনি আমার স্ত্রীকে কলেজ থেকে চাকরিচ্যুত করার খেলায় মেতে ওঠেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ মার্চ করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আমার স্ত্রীকে সাময়িক বহিষ্কার করার জন্য একতরফা সভা আহবান করে সভাপতি পাটোয়ারী। সে সময় বিষয়টি বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানালে তিনি এ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার জন্য সভাপতিকে অনুরোধ জানিয়ে পরদিন তার (ইউনওর) দপ্তরে সবাইকে যেতে বলেন।
আজিজুর রহমান বলেন, ১৯ মার্চ নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে বিষয়টি নিয়ে আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে নির্বাহী অফিসার অনুরোধ করেন। এরপর থেকে সভাপতি ক্ষুব্ধ হয়ে বেতন বইতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন। যেকারণে ওই সময়ে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা পহেলা বৈশাখের উৎসব ভাতা থেকে বঞ্চিত হন।
পূর্ণিমা দাসের স্বামী আজিজুর রহমান বলেন, সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী একাধিকবার তার ওপর হামলা চালিয়েছেন। গত পহেলা জানুয়ারি আমার স্ত্রীকে নিতে কলেজ গেটে গেলে সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী ও তার লোকজন আমাকে মারধর করে রক্তাক্ত করেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে আমি মামলাও করি। যা বিচারাধীন আছে।
স্থানীয়রা আরও জানান, পূর্ণিমা রানী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকরের জন্য সভাপতি তার কূটকৌশল অব্যাহত রাখেন। পূর্ণিমার সাময়িক বহিষ্কারাদেশ রেজ্যুলেশনে কেন আনা হয়নি এসব অভিযোগ এনে কলেজের অধ্যক্ষকে দোষারোপ করতে থাকেন তিনি। এক পর্যায়ে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের মার্চ মাসের বেতন বন্ধ রাখেন। বেতন বইতে স্বাক্ষর করার জন্য তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন বন্ধ রাখেন। পরে অবশ্য এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখে মার্চ মাসের বেতন বইতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন তিনি।
অভিযোগে জানা যায়, ৩০ মে কলেজের অধ্যক্ষ শামসুর রহমান ও শিক্ষক পূর্ণিমা রানীকে বাদ দিয়ে কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে সভাপতি ফের সভা করতে যান কলেজে। এসময় কলেজের কর্তব্যরত পিয়ন কাম নৈশপ্রহরী করোনার কারণে কলেজ বন্ধ থাকায় কলেজের গেট খুলে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সভাপতি ও তার লোকজন পাশের একটি স্কুলে গিয়ে সভা করার চেষ্টা করলেও পুলিশি হস্তক্ষেপে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ জুন কলেজের একটি নির্মিতব্য ভবনের লে-আউটের জন্য ঠিকাদাররা সেখানে আসেন। এ সময় ঠিকাদার ও তার লোকজন চলে যাওয়ার পরপরই সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী ও তার ভাই ইউপি চেয়ারম্যান দিলু পাটোয়ারীর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী কলেজে ঢুকে নৈশ্য প্রহরী শেখ রিপনকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করে। চিৎকারে তার বৃদ্ধ বাবা এগিয়ে আসলে তাকেও কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে তারা। এসময় বৃদ্ধ বাবাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে সন্ত্রাসীরা। পরে স্থানীয় লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এ বিষয়ে কলেজের সভাপতি ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন নৈশ্য প্রহরী রিপন হোসেন। ইতোমধ্যে ওই মামলায় সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী ও তার ভাই দেলোয়ার হোসেন পাটোয়ারীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন বাঘারপাড়া পুলিশ।
এদিকে সভাপতি নূরমোহাম্মাদ পাটোয়ারীর একের পর এক এসব অনৈতিক কর্মকান্ডের প্রতিকার ও তার দুর্নীতি অনিয়ম তদন্তের দাবিতে কলেজের অধ্যক্ষ শামসুর রহমান, কলেজের শিক্ষক পূর্ণিমা রানী দাস ও নির্যাতিত পিয়ন রিপন হোসেন যশোরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে আবেদন করেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসিল্যান্ডকে আহবায়ক করে ৩ সদস্যর তদন্ত টিম গঠন করেন।
ওই কমিটি তদন্ত শেষে সভাপতির বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেন। পরে নির্বাহী অফিসার তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিলে জেলা প্রশাসক সেটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে যশোর শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেন। এরই আলোকে গত ১৯ আগস্ট যশোর শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক কে এম রব্বানী স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে অনিয়ম, নির্মমতা, প্রতিহিংসা, নৃশংসতার কারণে কেনো তাকে সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে না মর্মে কারণ দর্শাও নোটিশ প্রদান করেন।
কলেজের অধ্যক্ষ শামসুর রহমান বলেন, শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক কারণ দর্শানো নোটিশ পাওয়ার পর পরই সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী আমার ওপর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছাড়াই একতরফা ভাবে আমাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে। তিনি বলেন, সভাপতি আমার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নিয়েছেন তা মোটেও আইনসিদ্ধ হয়নি। শুধুমাত্র প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধ ধামাচাপা দিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এসব কর্মকান্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে সভাপতি নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, অধ্যক্ষ শামসুর রহমানের বিরুদ্ধে এ সাময়িক বহিষ্কারাদেশ আইনমত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকায় এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। একই সাথে কলেজের শিক্ষক পূর্ণিমা রানী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কিছু গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে না বলে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ যে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছেন তার জবাব যথাযথ সময়ে পৌঁছে দেওয়া হবে।




