আকরামুজ্জামান ॥ মহামারি করোনা ভাইরাসের ক্ষতি থেকে দেশের কৃষি খাতকে রক্ষার জন্য সরকার এ বছর প্রণোদনা দিয়েছে। যশোর জেলাতেও এরই ধারাবাহিকতায় কৃষিতে বিভিন্ন ভাগে প্রণোদনার অর্থ ও সুবিধা দেয়া হয়েছে কৃষকদের মাঝে। তবে এসব প্রণোদনার টাকা আসলে প্রকৃত কৃষক পাচ্ছেন কি-না বা সুষম বন্টন হচ্ছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রান্তিক চাষিদের অভিযোগ সরকারিভাবে এসব প্রণোদনা দেয়া হলেও প্রকৃত কৃষকরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যেকারণে এসব প্রণোদনা সুবিধার আওতায় প্রকৃত কৃষদের আনার জন্য কৃষি বিভাগের প্রতি আহবান জানিয়েছেন চাষিরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছরই সরকার প্রান্তিক কৃষকের সহায়তার জন্য কৃষিতে নানাভাবে প্রণোদনা দিয়ে আসছে। তবে চলতি অর্থ বছরে করোনার ছোবল থেকে রক্ষার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ সহায়তাসহ বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে যশোরের প্রান্তিক চাষিদের সহায়তায় কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় জিওভিত্তিক বরাদ্দ দেয়া হয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে আউশ, আমন চাষে প্রণোদনা, উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে সবজি চারা ও বিতরণ, বীজতলা পনর্বাসন ইত্যাদি।
এসব ক্ষেত্রে নগদ অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি কৃষককে সার-বীজ, কীটনাশক প্রদানসহ উন্নত সেচ ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে সরকারিভাবে বরাদ্দ হওয়া এসব প্রণোদনার সুফল থেকে প্রান্তিক চাষিদের একটি বড় অংশই বঞ্চিত থাকছেন। যারা এর সুফল পাচ্ছেন তাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের লোকজন বা স্থানীয় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের পছন্দের লোকজন। সুবিধাপ্রাপ্ত এসব কৃষকরা তারা প্রণোদনার অর্থ বা সামগ্রী যথাযথ ব্যবহার না করে নয়-ছয় করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে যশোরের প্রান্তিক চাষিদের সহায়তায় কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় জিওভিত্তিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য খাত রয়েছে যেমন রবি মৌসুমে জেলার ৮ টি উপজেলার ১৩ হাজার ৩০০ কৃষকের অনুকূলে সার-বীজ ও নগদ টাকা বাবদ মোট ১ কোটি ৩৭ লাখ ১০ হাজার ৮০০ টাকা, উফশী আউশ চাষ বাবদ ৮ উপজেলার ৩ হাজার কৃষকের অনুকূলে সার, বীজ, কীটনাশক, নগদ টাকাসহ মোট ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ বাবদ ৫০ চাষির জন্য ৫৫ হাজার টাকা, ৮ উপজেলার ২ হাজার ৫০০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের মাঝে সার ও বীজ বিতরণ বাবদ ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও সবজি-পুষ্টি বাগান সৃজনে ২ হাজার ৯১২ জন কৃষকের অনুকূলে ৭৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা প্রণোদনা দেয়া হয়। এছাড়া বীজ ও পনর্বাসনে আরও টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ইতোমধ্যে এসব প্রণোদনা সুবিধা সংশ্লিষ্ট উপজেলার সুবিধাভোগী কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ সরকারি এ সহায়তার প্রায় পুরোটাই ভোগ করছেন সরকার দলের পছন্দের লোকজন। কৃষিতে যাদের বড় অবদান রয়েছে এমন সব কৃষকদের এ প্রণোদনার আওতায় আনা হয়নি। তারা জানেনও না এসব প্রণোদনার কথা।
জেলার আব্দুলপুর এলাকার সবজি চাষি আব্দুর রহমান বলেন, প্রায় প্রায় দুই যুগ ধরে কৃষি কাজের সাথে যুক্ত। ধান-সবজিসহ নানা ধরনের চাষ করে আসছি। কিন্তু সরকারি প্রণোদনা কি তা আজও জানি না।। স্থানীয় কিছু মানুষ আছেন তারা সামান্য জমিতে চাষ করেন শুনি তারাও নাকি সরকারের এসব প্রণোদনার সুযোগ পাচ্ছেন।
একই কথা বলেন, খাজুরা এলাকার কৃষক আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের লোকজন তাদের পছন্দের মানুষদের এসব তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এসব সুবিধা দেন। অথচ যারা প্রসিদ্ধ চাষি। কৃষিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখে আসছেন তাদেরকে এসব সুবিধা দেয়া হয় না। যারা সরকার দলের লোকজন তাদেরকেই বেছে বেছে এ তালিকায় অন্তর্র্র্ভুক্ত করা হয়। তিনি বলেন, আমি এ অঞ্চলের একজন দরিদ্র কৃষক। কিন্তু জন্মের পর এ ধরনের সুযোগ কখনও পায়নি।
একই এলাকার শহিদুল আলম নামে এক চাষি বলেন, প্রণোদনার এসব টাকা যথাযথ ব্যবহার হয় না। এসব সুবিধা কৃষি কাজের কথা বলে নেয়া হলেও তা ব্যক্তিগতভাবে খরচ করে ফেলা হয়। যেসব খাত দেখিয়ে এ প্রণোদনার সুবিধা নেয়া হচ্ছে তা আদৌ বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিলে আপনারা নিশ্চিত হতে পারবেন। প্রকৃত কৃষকরা এর সুবিধা পেলে একদিকে কৃষির যেমন লাভ হতো তেমনি কৃষকও লাভবান হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বিরেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, কৃষিতে যে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে তা যথাযথ নিয়ম মেনেই বন্টন করা হয়েছে। জেলার ৮ উপজেলার যেসব কৃষক এর সুবিধা পেয়েছেন তারা কোন দল করেন সেটি বিবেচ্য নয়, প্রকৃত কৃষকরাই এর সুবিধা পেয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি এসব প্রণোদনা বরাদ্দ বন্টনের জন্য প্রত্যেক উপজেলায় একটি কমিটি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওই কমিটির সভাপতি ও কৃষি কর্মকর্তা সদস্য সচিব। ফলে এ বিষয়ে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি দাবি করেন।




