আমদানিকারক সুবিধা পেলেও বেকায়দায় স্থানীয় উৎপাদকরা

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বেড়ে এখন সাত লাখ টনে এসে পৌঁছেছে। এরই সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাহিদা বেড়ে চলেছে এলপিজি সিলিন্ডারের। ফলে দেশের উদ্যোক্তারা এ সময় মনোযোগী হয়েছেন সিলিন্ডারের স্থানীয় উৎপাদনে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে স্থানীয় বিক্রয়ের ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করায় ভারসাম্যহীন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। কারণ সরাসরি সিলিন্ডার আমদানিকারকরা আগের মতোই আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা পাচ্ছেন। এতে করে সিলিন্ডার আমদানিতে উৎসাহ বাড়লেও স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা বড় আকারে বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় উৎপাদকরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় সিলিন্ডার স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রয়ের ওপর চলতি অর্থবছরে নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে (এসআরও নং-১৪৪ আইন/২০২০/১০৫ মূসক)। যদিও স্থানীয়ভাবে সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে এর আগে উৎপাদিত সিলিন্ডার বিক্রয়ের ওপর ভ্যাট অব্যাহতির (এসআরও নং-১৭২ আইন/২০১৯/২৯-মূসক) সুবিধা দিয়ে আসছিল সরকার। অন্যদিকে যারা সরাসরি সিলিন্ডার আমদানি করে দেশে বাজারজাত করছেন, তাদের জন্য প্রযোজ্য এসআরওতে আগের বছরের মতো চলতি অর্থবছরেও আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।
এ অবস্থায় আমদানির বিকল্প দেশীয় সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পদক্ষেপ হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনবিআরে লিখিতভাবে অনুরোধ জানিয়েছে এ খাতের উদ্যোক্তারা। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশীয় সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় বিক্রয়ের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এটা বাস্তবায়নে একদিকে যেমন দেশের সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হবে অন্যদিকে সিলিন্ডার আমদানি উৎসাহিত হবে। এতে করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাবে। আমদানি নিরুৎসাহিত করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও দেশীয় শিল্প ভালো রাখতে বর্তমান সরকার এর আগে আমদানি বিকল্প সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের স্থানীয় পর্যায়ে সিলিন্ডার বিক্রয়ের ওপর ভ্যাট অব্যাহতির সুযোগ দিয়ে আসছিল। নতুন করে ভ্যাট আরোপ করায় সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেসব লোকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে তা ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। চিঠিতে সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সিলিন্ডার বিক্রয়ের ওপর নতুন করে আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এলপিজি সিলিন্ডার উৎপাদন খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ২৭টি এলপিজি উৎপাদনকারী কোম্পানি সিলিন্ডার বাজারজাত করে আসছে। এর মধ্যে ১৩টি কোম্পানি সিলিন্ডারের নিজস্ব চাহিদা পূরণ করে অন্যান্য এলপিজি কোম্পািনিকেও সরবরাহ করে। এ ১৩টি সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৯০ লাখ পিস। যদিও দেশের চাহিদা বছরে ৬০ লাখ পিস সিলিন্ডার।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব মো. লিয়াকত আলী খান এ প্রসঙ্গে বলেন, আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে এখন প্রতিযোগিতা আনফেয়ার হবে। বিক্রয় পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ দেশে গড়ে ওঠা পুরো স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে নিরুৎসাহিত করবে। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আমদানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থার একটা ভারসাম্য থাকা জরুরি। এর আগের বছরেও আমদানি পর্যায়ে যেখানে ভ্যাট ছিল না। আবার অন্যদিকে দেশে উৎপাদনের বিক্রয় পর্যায়েও এ ভ্যাট ছিল না। এতে একটা ভারসাম্য ব্যবস্থা বজায় ছিল। কিন্তু এখন বিদেশ থেকে সরাসরি সিলিন্ডার আমদানির বেলায় আগের মতোই তাদের ভ্যাট দিতে হচ্ছে না। কিন্তু যারা দেশে উৎপাদন করছে তাদের ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে দেয়া হলো। মূলত এখানেই আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন পর্যায়ে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়ে গেছে। যেখানে স্থানীয় উৎপাদকরা সুবিধা পাওয়ার কথা সেখানে উল্টোটাই ঘটল। এটা বিবেচনায় নিয়ে এনবিআর কর্তৃক এসআরও সংশোধন না হলে নিশ্চিতভাবেই স্থানীয় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে। তাছাড়া আরো একটি শঙ্কার কথা হলো, স্থানীয়ভাবে আমাদের যে ফিউচার প্ল্যান তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।উৎপাদনে জড়িতরা বলছেন, সিলিন্ডার উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে মান নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। সিলিন্ডার যেটা সরাসরি আমদানি করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে এটার মান নিয়ন্ত্রণ সঠিক নাও হতে পারে।
বাংলাদেশে মূলত থাইল্যান্ড, চীন ও ভারত থেকে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি করা হচ্ছে। অন্যদিকে চাহিদার চেয়ে সিলিন্ডার উৎপাদনে অতিরিক্ত সক্ষমতা গড়ে উঠেছে দেশে। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো সিলিন্ডারের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে ও নিরাপত্তা বিধান করে ঝুঁকিমুক্ত সিলিন্ডার সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা সরকারের মূল লক্ষ্যের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার উৎপাদনে যুক্ত হয়েছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মূসকনীতি বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে  বলেন, স্থানীয়ভাবে সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের ব্যাপারে যোগাযোগ করেছে। আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরির বিষয়টি তারা লিখিতভাবেও জানিয়েছে। এটা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে।
দেশে এলপিজি সিলিন্ডার উৎপাদনে সক্রিয় প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে রয়েছে টিকে গ্যাস অ্যান্ড গ্যাস সিলিন্ডার, বিন হাবিব এলপিজি, ইউনিভার্সেল গ্যাস অ্যান্ড গ্যাস সিলিন্ডার লিমিটেড, জেএমআই এলপিজি, বিএম এলপিজি, ইউনিটেক্স এলপিজি, এসএল এলপিজি। এছাড়া ঢাকা ও মোংলা এরিয়ায় সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা এলপিজি, ওমেরা এলপিজি, পেট্রোমেক্স এলপিজি, এনার্জিপ্যাক এলপিজি, যমুনা এলপিজি, মেঘনা এলপিজি (ফ্রেশ), ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড। এছাড়া উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় আছে রানার এলপি গ্যাস ও নাভানা এলপিজি।
দেশের বাজারে সাড়ে ১২ কেজি, ৩০ কেজি, ৩৫ কেজিসহ বিভিন্ন মাপের সিলিন্ডারে এলপি গ্যাস বিক্রি হয়। এর মধ্যে সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার বাসাবাড়ি এবং হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহূত হয় ৩০ ও ৩৫ কেজির সিলিন্ডার। মূলত পাইপলাইনের গ্যাসের সংকট ও নতুন সংযোগ প্রদান বন্ধ থাকায় এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। তাছাড়া মানুষের গড় আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলেও প্রচলিত জ্বালানি লাকড়ির পরিবর্তে অনেক পরিবারই রান্নার কাজে এখন এলপি গ্যাস ব্যবহার করছে। সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ আবাসিক জ্বালানি চাহিদা এলপি গ্যাসের মাধ্যমে মেটানোর ঘোষণা দিয়েছে।