করোনার কারণে আটকে আছে পাপিয়ার দুই মামলার তদন্ত

লোকসমাজ ডেস্ক॥করোনা মহামারির কারণে আটকে আছে আলোচিত শামীমা নূর পাপিয়ার দুই মামলার তদন্ত। একটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হলেও বাকি দুটি মামলার তদন্ত কার্যক্রম থমকে আছে। মামলার তদন্ত সংস্থা র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, পাপিয়াকে তিন মামলায় গত মার্চে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল র‌্যাব। কিন্তু রিমান্ডে থাকা অবস্থায় পাপিয়ার করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ায় পাঁচ দিনের মাথায় তাকে আবার কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পাপিয়া বর্তমানে গাজীপুরের কাশিমপুরের মহিলা কারাগারে রয়েছেন।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শরীফুল্লাহ বুলবুল বলেন, পাপিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে অস্ত্র মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি মামলার তদন্ত এখনও চলছে। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে তাকে আবারও রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একইসঙ্গে দ্রুত মামলা দুটির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দর থেকে দুই সহযোগী ও স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমনসহ পাপিয়াকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এসময় তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, বাংলাদেশি ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যমানের জাল মুদ্রা, বিভিন্ন দেশের মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। একদিন পর ইন্দিরা রোডের বাসায় অভিযান চালিয়ে দুটি অবৈধ অস্ত্র, ২০ রাউন্ড গুলি, বিদেশি মদসহ আরও দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় বিমানবন্দর থানা ও শেরে বাংলানগর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন, মাদক ও অস্ত্র আইনে তিনটি মামলা দায়ের করে র‌্যাব। মামলাগুলো প্রথমে থানা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে তা র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মামলার তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, পাপিয়া-মতি সুমন দম্পতির সুনির্দিষ্ট কোনও পেশা ছিল না। মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি না করলেও ২০১৮ সালে পাপিয়া নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন। ঢাকা ও নরসিংদীতে তাদের গাড়ির শোরুম ও কার ওয়াশ সলিউশন সেন্টার রয়েছে। ইন্দিরা রোডে তাদের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, পাপিয়া ও তার স্বামী মতি সুমন নানা অপকর্ম করে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হন। পাপিয়া গুলশানের পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনের ভিআইপি স্যুট ভাড়া নিয়ে সেখানেই মাসে কোটি টাকা বিল পরিশোধ করতেন। তার বিরুদ্ধে জোর করে তরুণীদের দিয়ে অনৈতিক কাজ করানো এবং সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, পাপিয়া গত বছরের ১২ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৯ দিন ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে অবস্থান করেছেন বলে ওয়েস্টিন হোটেল কর্তৃপক্ষ তদন্ত সংস্থাকে জানিয়েছে। এজন্য পাপিয়া হোটেল কর্তৃপক্ষকে প্রায় এক কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন। তার এসব অর্থের কোনও বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি। পাপিয়া ও তার স্বামীর বিপুল অর্থের উৎস, তার অনৈতিক ব্যবসার সঙ্গে কারা কারা জড়িত তা জানার জন্য তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন। আদালত থেকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পেলেও করোনার কারণে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য মামলার তদন্তও শেষ করা যাচ্ছে না।
র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা জানান, পাপিয়া ও তার স্বামী মতি সুমনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল, গত ২৯ জুন সেই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পাপিয়ার অর্থ-সম্পদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ করা হচ্ছে। তার ব্যাংক লেনদেনসহ অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এসব অনুসন্ধান শেষ হলে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনেও মামলা দায়ের করা হবে।
এদিকে সিআইডির অর্গানাইজ ক্রাইম বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন দেশের পাপিয়ার অর্থ পাচার সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত তারাও ঘেঁটে দেখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকে তার অর্থ লেনদেনের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ঢাকায় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নরসিংদীতে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিষয়েও খোঁজ-খবর করা হচ্ছে। এসব তথ্য-উপাত্ত পেলে তার বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করা হবে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মোস্তফা কামাল বলেন, আমরা মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। অনুসন্ধান শেষে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে নতুন করে মামলা দেওয়া হবে।

ভাগ