তৌহিদ জামান ॥ শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার পরে পৌর কাউন্সিলর মোস্তাফিজুর রহমান মুস্তা ভাই ফোনে জানান, শামিম মারা গেছে! ইতস্তত করছি দেখে উনি বললেন, আমাদের ডাক্তার, গরিবের ডাক্তার শামিম! খবরটা শুনে বুকের ভেতর ধড়াক করে ওঠে! কতই বা বয়স শামিমের! তার কি কোনও রোগ ছিল- ভাবছি। মুস্তা ভাই জানান, করোনা সন্দেহ করা হচ্ছে! জবাব পাওয়া গেছে; আর এগুনোর দরকার নেই। যশোরের পুরাতন কসবা এলাকাসহ আশপাশের লোকজনের কাছে শামিম (শামিমুর রহমান) পরিচিত ছিলেন গরিবের ডাক্তার হিসেবে। এই শহরের জমজমাট এলাকা চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে ‘আনোয়ারা ফার্মা’ নামে ওষুধের দোকানটির মালিক তিনি। বাড়ি পুরাতন কসবা কাজীপাড়ার মানিকতলায়।
মানুষ জন্ম নিলে মারা যাবে- এটাই বিধান। কিন্তু মৃত্যুর পরেও কিছু কথা থেকে যায়। সেই মানুষটাকে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে রেওয়াজ অনুযায়ী সৎকারের দায়ও থাকে। কিন্তু চলমান সময়ে করোনা নামক একটি ুদ্রাতিুদ্র ভাইরাস মানুষের অহমিকায় ব্যাপক চিড় ধরিয়ে দিয়েছে। সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে নিজেদের দাবিকারী মানুষ তার সেই সম্মান খুইয়ে ফেলেছে সামান্য এই ভাইরাসের কাছে। বলছিলাম, শামিমের কথা। শামিম কি জানে মৃত্যুর পর তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়নি। সারারাত আর পরের দিনের অর্ধেক সময় হাসপাতালের বাউন্ডারিতে ছিল; একটা অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে! শামিম কি বুঝতে পেরেছে, জীবদ্দশায় তার আপন, অতি আপন মানুষগুলো, যারা কি না কোনও একসময় এক মুহূর্ত দেখতে না পেলে অস্থির হয়ে যেতো; সেই তারাই তাকে গোটারাত আর দিনের অর্ধেকটা সময় কাছে ভেড়েননি ভয়ে! মৃত্যুর পর কত অবহেলা জুটেছে তার কপালে! গরিবের ডাক্তার, কত মানুষকে জীবদ্দশায় সেবা করেছেন তার নিপুণ হাতে। আর আজ বাইরের কোনও একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের দিকে চেয়ে থাকতে হয়েছে পরিবারকে, কখন তারা আসবে- তার গোসল করাবে, জানাজা পড়াবে, দাফন করবে…
শামিমুর রহমান (৩৮) শুক্রবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান। তিনি আগে থেকেই লিভার, ডায়াবেটিস, চর্ম রোগে ভুগছিলেন। কয়েকদিন জ্বরসহ করোনার উপসর্গ দেখা দেয়। সেই কারণে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু জ্বর ১০১ ডিগ্রির নিচে না নামায় ডাক্তাররা শামিমকে শুক্রবার খুলনা রেফার করেন। শনিবার দুপুরে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা শামিমকে কারবালায় দাফন করেছেন। প্রত্যেক মানুষই নানা রোগ বহন করে তার শরীরে এবং পরিবারের সাথেই বসবাস করে থাকে। পরিবারই হচ্ছে তার শ্রেষ্ঠ হাসপাতাল, সেবাকেন্দ্র। কিন্তু এই করোনা নামক অসুখটি আজ মানুষকে তার স্বজনদের কাছ থেকে কতদূরে সরিয়ে দিয়েছে। পত্র-পত্রিকা খুললেই হৃদয়বিদারক সব ঘটনার অবতারণা এই করোনাকে ঘিরেই। আমরা দেখতে পাই-
ক. করোনা সন্দেহে নড়াইলের লোহাগড়ায় কিশোর ছেলেকে বাঁশবাগানে ফেলে গেলেন বাবা-মা : ১৪ জুন
গ. চট্টগ্রামের মাঝিরহাট থেকে বস্তায় ভরে বৃদ্ধ বাবাকে পাবনার চাটমোহরে ফেলে গেছে সন্তানরা : ২৬ মে
খ. টাঙ্গাইলের সখীপুর বনে পঞ্চাশোর্ধ্ব মাকে ফেলেন গেলেন সন্তানরা : ১৪ এপ্রিল
করোনা ভাইরাস যেমন আমাদের অমানুষ হতে শিখিয়েছে, তেমনি শিা দিয়েছে অনেককিছুরই।
এই মহামারী না এলে ঠিক বুঝতে পারতাম না আসলে কত বিভেদ রয়েছে আমাদের। আমরা বুঝতাম না – কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, একদম নিঃস্বার্থভাবে। এই করোনা আমাদের চিনিয়েছে- শিরদাঁড়া সোজা রাখা মানুষগুলোর চেহারা। আমরা খাতাকলমে আপ্তবাক্যে যাদের ভগবানের সাথে তুলনা করেছি সারাটাকাল, তারা কীভাবে পিছু হটে- সেগুলো দেখেছি, দেখছি অহরহ। আমরা প্রতিনিয়ত শিখছি- কীভাবে ুদ্রাতিুদ্র একটি ভাইরাস আমাদের সব পরিচয়কে ম্লান করে দিয়েছে! তারপরও করোনাকালে আমাদের বেশকিছু ভাল অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা শিখেছি- কীভাবে নিজেদের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। হাত ধুতে হয় কেন; শারীরিক দূরত্ব জিনিসটা কী, সামাজিক বন্ধন, দুঃস্থ-অসহায় মানুষের সহায়তায় কীভাবে সব মত-পথ-বিভেদ ভুলে দাঁড়াতে হয়। আমরা দেখেছি, স্বজনরা ফেলে গেলেও জীবনকে বাজি রেখে অনেকেই এসেছেন সেবার পথে। রাজধানী ঢাকা থেকে আমাদের মফস্বল শহরেও। নিঃস্বার্থ সেইসব মানুষের জন্যে শুভ কামনা। যাদের কাজ এখনও মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয়কে উজ্জ্বল করে আজও!





