আকরামুজ্জামান ॥ করোনাকালে শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন যশোরের নির্মাণ শ্রমিকরা। দীর্ঘ তিন মাস ধরে কর্মহীণ হয়ে তারা চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব শ্রমিকদের প্রণোদনার আওতায় আনার কথা বলা হলেও আজও পর্যন্ত তারা কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি। যে কারণে কর্মহারা মানুষগুলোর সংসারে কষ্টের কালোছায়া নেমে এসেছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমার যশোর জেলায় প্রায় ১৮ হাজার নির্মাণ শ্রমিক রয়েছে। এরমধ্যে মণিরামপুরে ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের দু’টি ট্রেড ইউনিয়নে ২ হাজার ৬০০, বাঘারপাড়ায় ২ হাজার, অভয়নগরে ১ হাজার ৩০০, শার্শায় ১ হাজার ৫০০, ঝিকরগাছায় ১ হাজার ৫০০, চৌগাছায় ১ হাজার ৫০০, কেশবপুরে ২ হাজার ৫০০ ও সদর উপজেলায় ৪ হাজার ৫০০ শ্রমিক রয়েছে। এসব শ্রমিকরা গত তিন মাস ধরে বেকার জীবন-যাপন করছেন। করোনার কারণে নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় তাদের অধিকাংশেই এখন কর্মহীন রয়েছেন। এ অবস্থায় তাদেরকে সহযোগিতাও করছেন না কোনো মহল।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল যশোর জেলা শাখার সভাপতি আইয়ূব হোসেন বলেন, যশোর জেলার হাজার হাজার নির্মাণ শ্রমিক এখন মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব শ্রমিকদের আজও পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। তিনি বলেন, গত এপ্রিল মাসে আমি নিজে শ্রমিকদের নাম ঠিকানা ও ভোটার আইডি কার্ডসহ একটি তালিকা প্রস্তুত করে সমিতির নেতাদের কাছে জমা দেই। আমাদেরকে বলা হয়েছিলো সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে। কিন্তু আজও পর্যন্ত তার কোন খবর মেলেনি। যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকার ইমারত নির্মাণ শ্রমিক শাহাজান আলী বলেন, আমাদের এই যশোর শহরে প্রায় দুই হাজার তালিকাভুক্ত শ্রমিক রয়েছে। যার মধ্যে নারী শ্রমিক বেশি। কাজ বন্ধ থাকায় সবাই অনাহারে অর্ধাহারে কোন মতে দিনাতিপাত করছি। শুনেছি সরকার ঘরে ঘরে চাল-ডাল পৌঁছে দিচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা কেউই কোনো সাহায্য পাইনি। কেউ আমাদের খবরও নেয়নি। কারও কাছে হাত পেতে চাইতেও লজ্জা লাগে। তিনি সরকারের প্রণোদনার জন্য যে তালিকা করা হচ্ছে তা ইউনিয়ন ও পৌরসভার মেম্বর ও কাউন্সিলররা করছেন। তারা তাদের পছন্দের মানুষের নাম দিচ্ছে। আমাদের নাম ওই তালিকায় থাকছেনা। জোহরা খাতুন নামে আরেক নির্মাণ শ্রমিক বলেন, আমাদের কোনো বীমা নেই। কাজের ঠিক ঠিকানা নেই। এই সময়ে গার্মেন্টস শ্রমিকরা আলোচনায় এলেও ইমারত নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ কিছু মানুষের সাহায্য-সহযোগিতাই এখন আমাদের একমাত্র অবলম্বন।
শহরের বকচর এলাকার আরেক নির্মাণ শ্রমিক কাইয়ূম হোসেন বলেন, কাজের সুযোগ না থাকায় বর্তমানে বৌ-বাচ্চা নিয়ে ভীষন বিপাকে পড়েছি। আমাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে শহর থেকে গ্রামে ফিরছে অনেকেই আবার অনিশ্চিত পথে গ্রাম থেকে শহরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা কীভাবে বেচে থাকবো তাই ভেবে পাচ্ছিনা। এ বিষয়ে ইমাররত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন যশোর সদর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহীন মাহমুদ বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে গত ২২ এপ্রিল ৪ হাজার ৫০০ শ্রমিকের মধ্যে ১ হাজার ৯৩১ জনের জাতীয় পরিচয়পত্র সংবলিত একটি তালিকা প্রস্তুত করে তাদের নামে সাহায্যে চেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে জমা দেই। এসব শ্রমিকদের প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনার আওতায় আনা হবে বলেও প্রশাসনের অনেকে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও কোনো সাহায্য পাননি এসব শ্রমিকরা। তিনি বলেন, বর্তমানে বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো একেবারেই বন্ধ। দু’একটি ছোট ছোট ব্যক্তিগত ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। যেখানে দুই থেকে চারজন শ্রমিক কাজ করতে পারছেন। বাকি সবাই বেকার হয়ে ঘরে বসে রয়েছেন। এসব শ্রমিকরা খুব কষ্টে আছেন। তিনি দ্রুত এসব শ্রমিকদের সহযোগিতার জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। বিষয়টি নিয়ে যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, করোনাকালে আমরা হতদরিদ্র মানুষদেরকে নানাভাবে সহযোগিতা করছি। সেটি মূলত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বরদের সাথে সমন্বয় করে। তবে কোনো সংগঠনের অনুকূলে বা তাদের তালিকা অনুযায়ী সরকারি অনুদান দেওয়ার সুযোগ উপজেলা পর্যায়ে খুবই সীমিত। এজন্য এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করলে ভালো হয়।





