আকরামুজ্জামান ॥ করোনাভাইরাসের কারণে গত তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে সব শিা প্রতিষ্ঠান। সংক্রমণ ইতিমধ্যে যশোরে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় শিার্থীরা তাদের শিা প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে ঘরবন্দি জীবনযাপন করছে। পাশাপাশি ভাইরাসের কারণে অনেক অভিভাবক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকের আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে বেশিরভাগ অভিভাবক অর্থনৈতিকভাবে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও যশোরের কিছু বেসরকারি শিা প্রতিষ্ঠান বেতনের জন্য শিার্থীদের অভিভাবকদের চাপ দিচ্ছে। তবে শিকরা বলছেন, করোনাকালে শিা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারাও নিজেদের বেতন নিয়ে সামনের দিনগুলোতে অনিশ্চয়তায় পড়তে যাচ্ছেন। যে কারণে তারা বেতনের জন্য অভিভাবকদের ফোনে যোগাযোগ অথবা মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন।
যশোর শহরের বেজপাড়া এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকেন হাবিবুর রহমান। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে টেকনিশিয়ান পদে অ^ল্প বেতনে কর্মরত। কিন্তু করোনার কারণে গত দু’মাস বেতন পাচ্ছেন না। ঘরভাড়া পরিশোধ করে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তার খেয়েপরে বেঁচে থাকা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে কয়েকদিন আগে তার বড় ছেলের শিা প্রতিষ্ঠান যশোর কালেক্টরেট স্কুল থেকে তাকে ফোন করে বকেয়া তিন মাসের বেতন পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। তিনি এখন এই বেতনের টাকা কোথা থেকে পাবেন তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন। একই কথা বলেন তৌকির আহমেদ নামে আরেক অভিভাবক। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। তবে করোনার কারণে দীর্ঘদিন তার দোকান বন্ধ ছিল। এখন খুললেও অনেক নিয়মের কারণে ক্রেতা নেই বললেই চলে। ফলে তার অর্থনৈতিক অবস্থা করুণ। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন। এমন অবস্থায় তার ছেলের শিা প্রতিষ্ঠান নবকিশলয় প্রি ক্যাাডেট স্কুল থেকে ফোন করে বকেয়া বেতন শোধ করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই অবস্থায় বেতন কোথা থেকে দেব? নিজেরাই ঠিকমতো চলতে পারছিনা। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি স্কুলের এই উচ্চহারের বেতন মওকুফ করা হোক।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু কালেক্টরেট স্কুল বা নবকিশলয় স্কুল নয়, যশোরের বেশিরভাগ বেসরকারি স্কুল এভাবেই বেতনের জন্য অভিভাবকদের কাছে ফোন অথবা মেসেজ দিয়ে বেতনের টাকা আদায় করছে। এমনকি কিছু স্কুল বেতনের পাশাপাশি পরীা ফি বাবদ টাকা আদায়ের কথা জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
একই কথা বলেন দাউদ পাবলিক স্কুলের এক শিার্থীর বাবা নূর ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গত ১১ জুন থেকে ট্রাস্ট ব্যাংকের সামনে বিশেষ বুথ করে এপ্রিল, মে এবং জুন মাসের বেতন গ্রহণ করা হচ্ছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে। আমি বেতন পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এদিকে কিছু কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই করোনাকালে মানবিক কারণে বেতন আদায়ে কাউকে চাপ দিচ্ছেন না। এ ব্যাপারে পুলিশ লাইনস স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক মনোতোষ কুমার নন্দী বলেন, ‘আমরা স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি পুলিশ সুপার মহোদয়ের সাথে আলাপ করেছি। তিনি এমন পরিস্থিতিতে বেতন আদায় বন্ধ রাখতে বলেছেন। এ কারণে আমরা কাউকে বেতনের জন্য ফোন করিনি বা মেসেজ দিইনি।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের ফোন করে বেতন চাওয়ার বিষয়ে কালেক্টরেট স্কুলের অধ্য মোদাচ্ছের হোসাইন বলেন, ‘ননএমপিও স্কুলগুলোর শিক কর্মচারীদের বেতন শিার্থীদের বেতনের ওপর নির্ভর করে। যে কারণে এই পরিস্থিতিতে আমাদের এই উদ্যোগ নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।’
নবকিশলয় স্কুলের অধ্য মোহাম্মদ আতাহার হোসেন বলেন, ‘আমরা এতদিন স্কুলের ফান্ড থেকেই শিকদের বেতন দিয়েছি। প্রতি মাসে শিক কর্মচারীদের বেতন বাবদ ৩ লাখ ৮৬ হাজার টাকা দিতে হয়। যা শিার্থীদের বেতন থেকেই দেওয়া হয়। নন এমপিও স্কুল হওয়ায় সরকারের কোন টাকা আমরা পাই না। আগামীতে শিক কর্মচারীদের বেতন দিতে হলে এ উদ্যোগ নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। কারণ শিক কর্মচারীদেরও পরিবার আছে। তবে আমরা কাউকে চাপ দিচ্ছিনা। মানবিক বিবেচনায় তারা যে যতটুকু বেতন পরিশোধ করতে পারেন আমরা সেটাই বলছি। ’
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বলেন, ‘বেসরকারি শিা প্রতিষ্ঠানের বেতন দেয়া না দেয়া নিয়ে সরকারিভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগুলো করছে। তবে অভিভাবকদেরতো একদিন না একদিন বেতন দিতেই হবে। তা না হলে এসব শিা প্রতিষ্ঠানের শিকরা বেতন পাবেন কোথা থেকে।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিক ও অভিভাবকদের উভয়কে মানবিক ভূমিকা রাখতে হবে। অভিভাবকদের জন্য এক সঙ্গে তিন মাসের বকেয়া বেতন দিতে যদি কষ্ট হয়ে যায় সে েেত্র বিকল্প কোনো উপায় খুঁজে বের করতে হবে।’





