মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা ॥ ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিক্ষতির ক্ষত এখনো পুরোপুরি না কাটলেও মোংলার জনগণ ক্রমেই সে ক্ষত কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছেন। মাস খানেকের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন প্রাণপন চেষ্টা চালাচ্ছে ঘুরে দাঁড়াতে। সরকারি ত্রাণ ও সহযোগিতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হলেও ভূক্তভোগী মানুষ নিজেরাই নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে অনেকেই মেরামত বা নতুন করে তৈরি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি। কেউ কেউ এখনও বাড়িঘর মেরামতে ব্যস্ত। আবার কেউ ঝড়ের সাথে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া বাগদা রেণুপোনা নতুন করে ঘেরে ছেড়েছেন। আবার তাদের ক্ষতিগ্রস্ত নৌকা ও জাল মেরামত করে নদীতে মাছও ধরছেন।
গত ২০ মে রাতে সুন্দরবন উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এ ঝড়ে মোংলা অঞ্চলের প্রায় ১০৭৫ টি পরিবার কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া ঝড়ের তাণ্ডবে বিপুল সংখ্যক ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিধ্বস্ত হয়। ঝড়ের সাথে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে প্রায় দু হাজার চিংড়ি ঘের ভেসে মাছ বেরিয়ে যায়। ভেঙে পড়ে নদী সংলগ্ন কয়েক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। জেলেদের অসংখ্য নৌকা ডুবে যাওয়াসহ জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম নদীর স্রোতে ভেসে যায়। এ ছাড়া সুন্দরবনের গাছ ভেঙে যাওয়াসহ নানা ধরনের স্থাপনা, জেটি, উডেন ট্রেইল, ওয়াচ টাওয়ার ও অবকাঠামোর ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের পর সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের জরুরিভাবে সহযোগিতা প্রদান করা হয়। দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ করা হয় চাল, ডাল, তেল, আলু, শুকনো ও শিশু খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, নগদ টাকা ও ঢেউটিন। দেয়া হয় দফায় দফায় নানা ধরনের সরকারি ত্রাণ। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগেও ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করা হয়। সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হয় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ, বিভিন্ন রাস্তা ও অবকাঠামো মেরামতের। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি চাষিদেরকেও সরকারি সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে কর্মকর্তারা বলছেন, আম্পানের পর সরকারিভাবে যে সাহায্য সহযোগিতা করা হয়েছে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে। ইতিমধ্যে সরকারি সহযোগিতা দিয়ে অনেকেই তাদের ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত করেছেন। এ ছাড়া সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ক্ষতি হওয়া বনবিভাগের স্থাপনা ও অবকাঠামো মেরামতে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ মিললেই এসবেরও মেরামত শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বন কর্মকর্তারা।
অপরদিকে এ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই অভিযোগ করে জানিয়েছেন, দুর্যোগের পর তেমন কোন সরকারি ত্রাণ বা সহায়তা পাননি। যে সামান্য সরকারি সহায়তা পেয়েছেন তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তার পরও তারা বাঁচার নতুন সংগ্রামে নেমেছেন। চেষ্টা চালাচ্ছেন আম্পানের ক্ষত কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর। মোংলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এ জেড এম তৌহিদুর রহমান জানান, আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১৮ শতাধিক ঘের মালিক ও চিংড়ি চাষির তালিকা তৈরি করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি চাষি ও ঘের মালিক সরকারি সহায়তা পেলে অনেকটাই ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। এতে করে এখানকার আয়ের প্রধান উৎস চিংড়ি খাত আবারো পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে। মোংলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. নাহিদুজ্জামান বলেন, আম্পান পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাগবে ইতিমধ্যে সরকারিভাবে দফায় দফায় চাল, ডাল, তেল, আলু, শুকনো ও শিশু খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, নগদ টাকা, ঢেউটিন এবং বিভিন্ন ত্রাণ প্রদান করা হয়েছে, যা এখনও চলমান। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও অবকাঠামো সংস্কারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মোংলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাহের হাওলাদার জানান, আম্পান পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে সরকারি সহায়তা বণ্টন করায় এখানকার মানুষ দুর্যোগের সময় তেমন বড় ধরনের কষ্ট পাননি। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারি সহযোগিতা পাওয়ায় তারা সময়ের সাথে সাথে এখন নিজেরাই ঘুঁরে দাঁড়াতে পারছেন। পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন জানান, সুন্দরবন থেকে সব ধরনের গাছ কাটা নিষিদ্ধ। সে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গাছ যে ভাবে আছে সেভাবেই রাখা হবে। কোনো গাছ কাটা হবে না। সুন্দরবন সময়ের সাথে সাথে তার নিজের ক্ষতি নিজেই পুষিয়ে নিতে পারবে। তিনি আরো বলেন, প্রতিবারের দুর্যোগে বন তার প্রাকৃতিক নিয়মে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পনের প্রভাবে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আমরা বরাদ্দ পেলে খুব শিগগির অবকাঠামোর সংস্কার কাজ শুরু করব।




