আকরামুজ্জামান ॥ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে যশোর জেলাকে রেড জোন, ইয়েলো জোন ও গ্রিন জোন এই তিনভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে করোনা সংক্রমণের উচ্চতায় থাকা এলাকাকে রেড জোন চিহ্নিত করে লকডাউন ঘোষণা করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন।কিন্তু এসব এলাকার লকডাউন কোথাও মানছে না মানুষ। স্থাণীয় লোকজনতো দূরের কথা অন্য এলাকার মানুষও অবাধে যাতায়াত করছেন সংরতি এই জোনে। অভিযোগ উঠেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ের অভাবে যশোরে কার্যত রেড জোন, ইয়েলো জোন, গ্রিন জোন কোনটিই বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
দেশে করোনা সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখার পর থেকে যশোর জেলা অনেকটা নিরাপদে থাকলেও গত আড়াই মাস ধরে জেলায় করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। বর্তমান জেলায় করোনা রোগীর সংখ্যা মোট ২৮৮ জন। মারা গেছেন ২ জন। তবে করোনা উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত জেলায় মোট ৯ জনের মৃত্যুর খবর রয়েছে। এ অবস্থায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের এলাকাভিত্তিক সংখ্যা বিবেচনায় যশোর জেলার ১৭টি এলাকাকে রেড জোন ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। গত ১৬ জুন সকাল ৬টা থেকে রেড জোন এলাকাগুলোতে লকডাউন কার্যকর হওয়ার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন পুরো এলাকা লকডাউন না করে কেবল রোগী আছে এমন স্থানের এক শ গজ এলাকা লকডাউন করেছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে এসব এলাকাতেও এখনও পর্যন্ত লকডাউন কার্যকর হয়নি। লকডাউন কার্যকর ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে কারা দায়িত্বপালন করবেন সে বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো মহলই নিশ্চিত নন। সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও জানেন না আসলে কারা সার্বিক দায়িত্বপালন করবেন এসব এলাকায়।
জেলা প্রশাসনের একটি নির্ভযোগ্য সূত্রে জানা গেছে,সারাদেশে যেসব এলাকায় রেড জোন, ইয়েলো জোন চিহ্নিত করে লকডাউন কার্যকর হচ্ছে, সেখানে মূলত জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সার্বিক তদারকি করছেন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু যশোরে স্বাস্থ্য বিভাগ এক্ষেত্রে একেবারেই উদাসীন। যেকারণে করোনায় সংক্রমণের উচ্চতায় থাকা এলাকাকে রেড জোন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে লকডাউন কার্যকর হলেও তা মানছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সাথে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ের অভাবে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
এ বিষয়ে যশোর পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মুকসিমুল বারী অপু বলেন, আমার এলাকার নওয়াপাড়া রোড ও ধানপট্টি এলাকায় করোনা রোগী থাকায় সেখানে গত ১৬ জুন থেকে লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। এলাকার লোকজনই সেখানে সচেতনভাবে চলাফেরা করছেন। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। তিনি বলেন, ১৬ জুন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে গঠিত সদর উপজেলা কমিটির সভায় আমাদেরকে বলা হয়েছিলো লকডাউন এলাকায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার থাকবে। পাশাপাশি স্থাণীয় কমিউনিটি দায়িত্বপালন করবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সংস্থাকে লকডাউন এলাকায় দেখা যায়নি। তিনি বলেন, আমার এলাকার মানুষের চলাচল বন্ধে আমরা বলপ্রয়োগ করতে পারি না। এজন্য প্রশাসনের সার্বিক তৎপরতা থাকলে ভালো হয়। মূল কথা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে আমাদের সমন্বয়ের অভাবে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না। ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যেসব এলাকায় লকডাউন করা হবে অর্থ্যাৎ যেখানে করোনা রোগী থাকবে সেখানে বাইরের কোনো লোক প্রবেশ করতে পারবে না। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দেয়া গণবিজ্ঞপ্তিতেও তা উল্লেখ রয়েছে। অথচ নওয়াপাড়া রোড ও ধানপট্টি এলাকায় বাইরের লোকজনও যে যার মতো চলাফেরা করছেন। লকডাউনের জন্য দেওয়া বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে যাতায়াত করছেন লোকজন।
একই অভিযোগ যশোর উপশহর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এহসানুর রহমান লিটুর। তিনি বলেন, লকডাউন কার্যকর হওয়ার পর থেকে আজও পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগ বা প্রশাসনের কেউ খোঁজ নেননি। আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে চৌকিদার নিয়োগ করে সেটি কার্যকর করছি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার অভাবে রেড জোন এলাকায় দেদারছে মানুষের চলাচল বেড়েই চলছে। এমনকি বাইরে থেকে প্রাইভেট কার মাইক্রোবাসে করে মানুষ অবাধে যাতায়াত করছে। ইউপি চেয়ারম্যান লিটু বলেন, আমরা এলাকার জনপ্রতিনিধি। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য আমরা কিছু দায়িত্ব পালন করতে পারি। কিন্তু এমন কিছু বিষয় আছে যা পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছাড়া পারেন না। তিনি বলেন, লকডাউন কার্যকর করতে হলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। নইলে এর কোনো বাস্তবতা থাকবেনা। এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ মো. আবু শাহীনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরেও এসেছে। এজন্য শুক্রবার বিকেলে যশোর সার্কিট হাউজে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে গঠিত জেলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় রেড জোন এলাকায় লকডাউন কার্যকরের বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে লকডাউন কার্যকর করা হবে এবং এর পুরো দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের। তিনি বলেন, লকডাউন কার্যকর নিয়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ খোঁজ নিচ্ছে না বলে জনপ্রতিনিধিরা যে অভিযোগ করছেন তা সঠিক নয়। আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা সব সময়ই এসব স্থানে গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন।





