বাংলাদেশের পিক টাইম কবে?

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার ১০৪ দিন পর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৩৫ জনে। প্রথম রোগী শনাক্তের ২৮ দিন পর ৬ এপ্রিল শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়ায়, ১৪ এপ্রিল ছাড়ায় এক হাজার। ১০ হাজার ছাড়ায় গত ৪ মে, ২০ হাজার ১৫ মে এবং ৫০ হাজার ছাড়ায় গত ২ জুন। এরপরের ৫০ হাজার বেড়েছে মাত্র ১৬ দিনেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের ধারা এখন ঊর্ধ্বমুখী। পিক টাইম কবে সেটা এখনি বলা যাচ্ছে না। কারণ, দেশে সংক্রমণের পিক টাইম কবে হতে পারে তা নিয়ে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও ‘প্রজেকশনই’ হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ আশা করছেন, এ মাসের শেষে বা আগামী মাসের শুরুতে দেশে সংক্রমণ কমতে পারে।
দেশে বর্তমানে ৬১টি ল্যাবে (পরীক্ষাগার) করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এক হাজার ৩৮৮ জনের। করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ৪২ হাজার ৯৪৫ জন। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার প্রায় ৩৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্তের ঘোষণা দেয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এর ঠিক ১০ দিন পর করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম রোগী মারা যান ১৮ মার্চ। কোভিড-১৯ নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত বুলেটিনে (১৮ জুন) স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, বাংলাদেশ একটি জনবহুল এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, অপর পক্ষে করোনাভাইরাসও অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাস। এ কারণে অসতর্ক চলাফেরা এবং স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে না চললে এ দেশে সংক্রমণের হার মোকাবিলা করা কঠিন। তিনি আরও বলেন, দেশের করোনাভাইরাস আগামী এক-দুই বা তিন মাসে যাবে না। এটি দুই থেকে তিন বছর বা তারচেয়েও বেশি স্থায়ী হবে। যদিও সংক্রমণের মাত্রা উচ্চহারে নাও থাকতে পারে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের করোনা বিষয়ক কমিটির প্রধান ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শাহ মুনির হোসেন বলেন, ‘সংক্রমণ উপরের দিকে যাচ্ছে, তবে পিকে আছি কিনা সেটা কেউ বলতে পারবে না। তবে গত কয়েক দিনের রোগী শনাক্তের হার বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে আগামী আট থেকে ১৫ দিন এরকম চলতে পারে। এ মাসের শেষদিক নাগাদ রোগী দেড় লাখ ছাড়িয়ে যাবে এবং এ মাসের শেষের দিকে সংক্রমণ কমতে পারে বলে ডাটা বিশ্লেষণ করে মনে হয়েছে।’ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রোগী বাড়তেই থাকবে বলেও মন্তব্য করেন শাহ মুনির। তিনি বলেন, ‘জুন মাসের প্রথম দিকে সংক্রমণ কমতে থাকে বলে মনে হলেও আজকের অবস্থা হয়েছে ঈদের ছুটির কারণে। আর এখন যদি কঠোর লকডাউন না করা হয়, স্বাস্থ্যবিধি না মানা হয় তাহলে সংক্রমণ আবার বাড়বে।’ স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড-১৯ বিষয়ক সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষের যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মো রিজওয়ানুল করিম বলেন, ‘আমরা সংক্রমণের পিকের দিকে যাচ্ছি। জুনের শেষ সপ্তাহ বা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পিক টাইম হবে। তখন কয়েকদিন সংক্রমণ হাই লেভেল থেকে আবার নিচের দিকে নামতে শুরু করবে।’
তবে বাংলাদেশে কোনও ফর্মুলা মেনে পিক টাইম আসবে না বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির দিকে যাচ্ছি, দিনকে দিন সংক্রমণ বাড়ছে। আর এই সংক্রমণ আপনাআপনি বিদায় নেবে না। রোগীদের শনাক্ত করে তাদের আইসোলেশন করে সংক্রমণের বোঝা কমাতে হবে। তার সঙ্গে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ কমানোর অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে হঠাৎ সংক্রমণ না হলে অন্যান্য দেশের মতো সেরকম পিক হবে না। সারা দেশে যে সংক্রমণ হচ্ছে তা স্বাভাবিক গতির। এই সংক্রমণ বন্ধ করতে আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিনের মতো অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি পালনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী আতিক আহসান বলেন, ‘ঈদের ছুটি এবং সাধারণ ছুটি ঘোষণার ইমপেক্ট হচ্ছে বর্তমানের শনাক্ত হওয়া রোগী। সে হিসেবে পিক টাইম সামনে অপেক্ষা করছে। এখন পর্যন্ত মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা গড়ে আড়াই হাজারের মতো। ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হয়ে থাকলে কিন্তু জনসংখ্যার শতকরা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশকে ইনফেক্টেড হতে হবে। যতক্ষণ না সেটা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত পিক হচ্ছে না বলে আমি মনে করছি না।’ দেশে এখন সংক্রমণের হার বাড়ছে, এটা বাড়তেই আছে মন্তব্য করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক বলেন, ‘যাদের পরীক্ষা হচ্ছে তাদের মধ্যে সংক্রমণের হার দেখা যাচ্ছে, এটা মোট জনসংখ্যার ওপর সংক্রমণের হার নয়। বিশাল একটা জনগোষ্ঠী পরীক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর সেজন্যই কবে পিকে পৌঁছাবো তা বলার সময় আসেনি। কিন্তু সংক্রমণ বাড়ছে, বাড়বে। কিন্তু দেশে প্রথম থেকেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল ঠিক করা হয়নি। কতদিনে, কীভাবে এবং কী করতে হবে আমাদের জানা নেই। বাংলাদেশ এখানে ফেইল করেছে এবং আজ পর্যন্ত সেটা ঠিক করতে পারিনি। আর কৌশল হিসেবে নেওয়া লকডাউন না ছুটি- এ কনফিউশনে কেটেছে অনেক দিন। লকডাউন পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করেই পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হলো, দোকানপাট খুলেছে, আর এখন তো কিছুই নেই।‘ লকডাউন তুলে দেওয়ার একটা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান থাকতে হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সেই এক্সিট প্ল্যান আমরা তৈরি করি নাই। তবে দেরিতে হলেও জোনভিত্তিক যে লকডাউন করা হচ্ছে তাতে করে কিছুটা হলেও হয়তো কাজে লাগতে পারে।’