বিদ্যালয়ের সভাপতি ৭০ লাখ টাকা নিলেন ১২ জনের কাছ থেকে চাকরি দেয়ার নামে!

স্টাফ রিপোর্টার, মনিরামপুর (যশোর) ॥ যশোরের মনিরামপুর টেকারঘাট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও দপ্তরি পদে নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পবিত্র বিশ্বাস অন্তত ১২ জন প্রার্থীর কাছ থেকে অগ্রিম উৎকোচ বাবদ প্রায় ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু টাকা গ্রহণের একবছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কাউকে চাকরি দেয়া হয়নি। ফলে ভুক্তভোগীরা তাদের টাকা ফেরৎ নিতে পবিত্র বিশ্বাসের কাছে বার বার ধর্ণা দিয়েও কোন প্রতিকার পাননি। বরং অভিযোগ রয়েছে, পবিত্র বিশ্বাস এখনও সকল প্রার্থীকে চাকুরি দেয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সময় ক্ষেপণ করছেন।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, নেহালপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক অষ্টম শ্রেণি পাস পবিত্র বিশ্বাস টেকারঘাট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হন গত বছরের ৯ এপ্রিল। এ সময় বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও দপ্তরির পদ দু’টি শূন্য থাকে। তিনি সভাপতি হওয়ার পর থেকে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, শূন্যপদে প্রধান শিক্ষক পদে চাকুরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ছয় জনের কাছ থেকে অগ্রিম বাবদ ৪০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন পবিত্র বিশ^াস। এর মধ্যে পাঁচ জনের পরিচয় জানা গেছে। প্রধান শিক্ষক প্রার্থী অপূর্ব বিশ্বাস জানান, তার কাছ থেকে ৩ লাখ, তপতী বিশ্বাসের কাছ থেকে ৫ লাখ, কল্যাণ কুমারের কাছ থকে ১ লাখ, বিচারন কুমারের কাছ থেকে ৪ লাখ, দেব প্রসাদ সরকারের কাছ থেকে ৫ লাখসহ ছয় জনের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন পবিত্র বিশ্বাস। এর মধ্যে কল্যাণ কুমার মন্ডল টেকারঘাট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে চাকুরিরত রয়েছেন। তিনি জানান, গত বছর চাকুরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ১০ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তির পর পবিত্র বিশ^াস তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা অগ্রিম নেন। কিন্তু একবছর পার হলেও অদ্যাবধি তাকে চাকুরি দেয়া হয়নি এমনকি তার টাকাও ফেরত দেয়া হয়নি। অপর প্রার্থী অপূর্ব বিশ্বাস জানান, তাকে প্রধান শিক্ষকের পদে চাকুরি দেয়ার জন্য পবিত্র ১২ লাখ টাকা চুক্তি (মৌখিক) করে এক বছর আগে তিন লাখ টাকা অগ্রিম নেন পবিত্র বিশ^াস। কিন্তু তাকেও চাকুরি দেওয়া হয়নি। অপূর্ব বিশ্বাস জানান, তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন পবিত্র বিশ^াস প্রধান শিক্ষকের পদে চাকুরি দেওয়ার কথা বলে আরো ৬/৭ জনের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছেন। ফলে তিনি চাকুরির আশা ছেড়ে দিয়ে অগ্রিম দেয়া তিন লাখ টাকা ফেরত পেতে পবিত্রের কাছে বার বার ধর্ণা দিলেও কোন লাভ হয়নি। অপূর্ব বিশ্বাস জানান, টাকা ফেরত নিতে গেলে পবিত্র বিশ^াস এখনও তাকে আশ্বাস দিচ্ছেন চাকরি দেওয়ার। একই অভিযোগ করেন অন্য প্রার্থীরাও। অপর দিকে দপ্তরি পদে নিয়োগ দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ১২ লাখ টাকা চুক্তি করে এলাকার সাগর কুমার নামে এক যুবকের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা অগ্রিম নেন পবিত্র বিশ^াস। এছাড়াও অগ্রিম টাকা নেয়া হয় সায়ফুল ইসলামসহ আরো পাঁচজনের কাছ থেকে মোট ৩০ লাখ। প্রধান শিক্ষক ও দপ্তরি পদে তিনি মোট টাকা নিয়েছেন প্রায় ৭০ লাখ। অবশ্য ইতিপূর্বে পবিত্র বিশ্বাস নিয়োগ দেয়ার জন্য পত্রিকায় দু’বার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু তার নিয়োগ বাণিজ্যের খবর জানাজানি হলে অভিভাবকসহ এলাকাবাসীর প্রচন্ড বাধার মুখে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য শামিম গাজী, নেহালপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জেলা পরিষদ সদস্য ফারুক হোসেন জানান, পবিত্র বিশ্বাস এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে তিনি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হয়েছেন। ফলে নিয়োগ বাণিজ্যসহ যা খুশি তাই করবেন। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন জানান, কোন অবস্থাতেই পবিত্র বিশ্বাসকে নিয়োগ বাণিজ্য করতে দেয়া হবে না। তবে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পবিত্র বিশ্বাস এ প্রতিবেদককে বলেন, যোগ্য প্রার্থীকে নিয়োগের পর অন্য প্রার্থীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু পরক্ষণে তিনি বলেন, ‘আমি কারো কাছ থকে টাকা গ্রহণ করিনি।’ স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিদ্যুৎ কুমার মল্লিক জানান, নিয়োগ দেয়াকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়েছে তাতে তার (বিদ্যুৎ কুমার) পক্ষে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বিকাশ চন্দ্র সরকার জানান, সভাপতির অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ইতিপূর্বে দু’বার নিয়োগ বোর্ড বাতিল করা হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পবিত্র বিশ্বাসকে খারাপ লোক আখ্যা দিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, নিয়োগ বাণিজ্যসহ তার সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

ভাগ