তদন্ত করবে পুলিশ অগ্নিদগ্ধ সাংবাদিক নান্নুর মৃত্যু

লোকসমাজ ডেস্ক॥ দৈনিক যুগান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেনা নান্নু মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এদিকে ছেলের মৃত্যুর ছয় মাস পর একই ঘরে একইভাবে নান্নুর এ মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল শনিবার সকালে মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নুর মৃত্যু হয় বলে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন। মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সলেমান বিশ্বাসের ছেলে। বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় নিজ বাসায় দগ্ধ হন নান্নু। ইনস্টিটিউটে ভর্তির পরপরই ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছিলেন, তার শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে। প্রায় ছয় মাস আগে তার ছেলে স্বপ্নিল আহমেদ পিয়াস (২৪) দগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।
নান্নুর স্ত্রী শাহীনা হোসেন পল্লবী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের জানান, যে ঘরে তাদের সন্তান স্বপ্নিল অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল, সেই ঘরেই বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনা ঘটে। “রাতে অফিস থেকে বাসায় ফিরে ও নামাজ পড়ে ভাত খেল। পরে আমরা দুজনে গেলাম স্বপ্নিলের ঘরে। ও খাটে বসা ছিল, সুইচ অন করতেই বিকট শব্দ হল, পরে দেখি ঘরে আগুন, নান্নুর শরীরের পেছন দিক জ্বলছে।” পরে নান্নু নিজেই বাথরুমে গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে নিজের শরীরের আগুন নেভান। ছাদে গিয়ে পাইপ এনে ঘরে ছড়িয়ে পড়া আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।
অন্য ফ্যাটের লোকজন তখন ছুটে এসে নান্নুর শরীরের অবস্থা দেখে হাসপাতালে নিয়ে যান। অন্যরা ঘরের আগুন নিভিয়ে ফেলেন। ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ করে কর্মকর্তা এরশাদ হোসোইন জানান, আগুনের খবর পেয়ে তারা আফতাবনগরের ওই দশতলা ভবনের অষ্টম তলার ফ্যাটে নান্নুর বাসায় গিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়। নান্নুর স্ত্রী জানান, স্বপ্নীল মারা যাওয়ার পর তারা ওই ফ্যাটে না থেকে বেশ কিছুদিন অন্য বাসায় ছিলেন। এরমধ্যে পুড়ে যাওয়া ঘর ঠিক করা হয়। প্রায় ছয় মাস পর জুনের শুরুতে আবার এই ফ্যাটে ওঠার কথা জানিয়ে পল্লবী বলেন, “বাসায় ওঠার পর থেকে গ্যাসের গন্ধ পাচ্ছিলাম। বিষয়টি ডেভেলপার কোম্পানিকে জানানোও হয়েছিল। বলেছিল, শুক্রবার কোম্পানি থেকে লোক এসে দেখবে।” যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, “নান্নু আমাদের সঙ্গে আছেন বহু বছর ধরে, শুধু মাঝে কিছুদিন ছিলেন না। তখন নিজে একটি ইউটিউব চালাতেন। ছেলের মৃত্যুর পর গত মার্চ মাসে আবার যুগান্তরে যোগ দেন।” নান্নুর মরদেহ হাসপাতাল থেকে তার আফতাব নগরের বাসায় নেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে গ্রামের বাড়ি যশোরে নিয়ে সন্তান স্বপ্নিলের পাশে দাফন করা হবে বলে পারিবারিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান ক্রাবের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বিকু। তবে নান্নুর বড় ভাই নওয়াপাড়ার বাবলুর রহমান জানান, নান্নুর ইচ্ছা অনুযায়ী তার মরদেহ দাফন করা হবে শ্বশুর বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ভায়না গ্রামে। নান্নুর মৃত্যুতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ চৌধুরী, ক্রাইম রিপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবুল খায়ের এবং সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বিকু শোক প্রকাশ করেছেন। তারা নান্নুর শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানিয়েছেন। বিএফইউজে সভাপতি মোল্লা জালাল, মহাসচিব শাবান মাহমুদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপুও শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। একই সাথে পরপর দুবার একটি বাসার একটি কে আগুন লেগে পিতা-পুত্রের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠ তদন্তও দাবি করেন সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতারা। সাংবাদিক নান্নুর মৃত্যুতে পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদও শোক জানিয়েছেন।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডে সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নুর মৃত্যুর ঘটনায় ‘আপাতত’ একটি অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত করে পুলিশ বলছে, তারা পুরো বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী পদপে নেবে। অল্প সময়ের ব্যবধানে ওই বাড়িতে দুই অগ্নিকাণ্ড ঘটনায় এেেত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে সাংবাদিক সংগঠনগুলো। ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, “কেন পর পর দুই বার একই কে আগুন লাগলো। তা ফায়ার সার্ভিস তদন্ত করবে।” আবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে পারিবারিক কোনো কলহের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও যাচাই করবেন বলে জানিয়েছেন বাড্ডা থানার ওসি পারভেজ ইসলাম। তিনি বলেন, “গ্যাসের সমস্যার কথা বলা হচ্ছে। তবে গ্যাসের কোনো গন্ধ পেলাম না। আর রান্নাঘর ঠিক আছে। যে ঘরে আগুন লেগেছে, সেই ঘরের মালামাল শুধু পুড়েছে।” এক প্রশ্নের উত্তরে ওসি বলেন, “রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়া হওয়ার কথা বলছে আশপাশের মানুষ।” ফ্যাটের ভেতরে ঝগড়া অন্য ফ্যাট থেকে শোনা কীভাবে গিয়েছিল- প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “বারান্দায়ও ঝগড়া হয়েছে বলে আশপাশের মানুষ জানিয়েছে।” পুলিশ কর্মকর্তা পারভেজ বলেন, হাসপাতালেই নান্নুর স্ত্রী শাহীনা হোসেন পল্লবীর স্বার নিয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। “আপাতত অপমৃত্যু মামলা নেওয়া হয়েছে। ক্রাইমসিন ও ফরেনসিক বিভাগ ঘটনাস্থলে কাজ করবে। আর ফায়ার সার্ভিস প্রতিবেদন দেবে বলেছে। যদি এখানে অন্য কিছু পাওয়া যায়, ভবন কর্তৃপে গাফিলতি বা আগুনের ঘটনায় কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তাহলে সেই অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ভাগ