লোকসমাজ ডেস্ক॥ চরম সংকটে পড়েছে মালয়েশিয়ার পাম অয়েল শিল্প। একদিকে নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর ধাক্কা, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধে বাজার হারানোর পরিস্থিতিতে এ সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। কমতির দিকে পাম অয়েলের দাম। ক্রমেই শ্লথ হয়ে আসছে পণ্যটির রফতানিও। এ পরিস্থিতিতে অন্যতম প্রধান এ রফতানি পণ্যটির বাজার চাঙ্গা করতে সচেষ্ট হয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। এর অংশ হিসেবে চলতি বছরজুড়ে বিনা শুল্কে পাম অয়েল রফতানির ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে মালয়েশীয় পাম অয়েলের চাহিদা আগের তুলনায় বাড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। খবর স্টার অনলাইন ও রয়টার্স।
ইন্দোনেশিয়ার পর মালয়েশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ পাম অয়েল উৎপাদক ও রফতানিকারক দেশ। সম্প্রতি দেশটির প্রধানমন্ত্রী মহিউদ্দিন ইয়াসিন জানান, চলতি বছরের বাকি সময়ে মালয়েশিয়া থেকে অপরিশোধিত পাম অয়েল, অপরিশোধিত পাম কার্নেল অয়েল এবং পরিশোধিত পাম কার্নেল অয়েল রফতানিতে কোনো ধরনের রফতানি শুল্ক দিতে হবে না। এক্ষেত্রে শূন্য রফতানি শুল্কের সুবিধা পাওয়া যাবে।
গত কয়েক মাসের ধারাবাহিকতায় চলতি জুনেও মালয়েশিয়া থেকে পাম অয়েল রফতানিতে শূন্য শুল্ক হার বজায় রয়েছে। মূলত এ নীতি চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মহিউদ্দিন ইয়াসিন।এ বিষয়ে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বাজার বিশ্লেষক সাথিয়া ভারকা বলেন, শূন্য শুল্ক হার চলতি বছর প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় মালয়েশিয়ার পাম অয়েলের দাম কমিয়ে দেবে। এতে চীন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের পাশাপাশি ইউরোপীয় ক্রেতারা অপরিশোধিত পাম অয়েল কিনতে মালয়েশিয়ার প্রতি ঝুঁকবেন।
২০২০ সালের শুরু থেকেই চরম সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে মালয়েশীয় পাম অয়েল শিল্প। ওই সময় চীনে করোনা মহামারী চরম আকার ধারণ করে। দেশটিতে লকডাউন আরোপ হলে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ থাকায় কমে যায় পাম অয়েলের চাহিদাও। ফলে শীর্ষ আমদানিকারক দেশ চীনের বাজারে মালয়েশিয়া থেকে পাম অয়েলের রফতানি কমতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে পণ্যটির বাজারেও। রফতানি শ্লথতায় মালয়েশিয়ায় পাম অয়েলের বাজারে দরপতন দেখা দেয়। চলতি বছরের শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমানে মালয়েশীয় পাম অয়েলের দাম এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ কমে গেছে।
তবে ভারতের সঙ্গে মালয়েশিয়ার বিরোধটা আরেকটু পুরনো। এ বিরোধের শুরুটা মূলত রাজনৈতিক। গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুটো উদ্যোগ মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিরোধের সূচনা করে। এর একটি ভারতের আলোচিত-সমালোচিত নাগরিকত্ব আইন। অন্যটি ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা খর্ব করা। মোদি যখন এ দুটো উদ্যোগের বাস্তবায়ন শুরু করেন, তখন মালয়েশিয়ায় ক্ষমতায় ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক মাহাথির মোহাম্মদ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথির ‘মুসলিম বিদ্বেষী’ উল্লেখ করে ভারত সরকারের এ দুটি উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেন।
এ সময় মাহাথিরের একের পর এক ভারতবিরোধী মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে নয়াদিল্লি। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, এগুলো একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাই এসব নিয়ে বিদেশী কোনো সরকারপ্রধানের তির্যক মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এর পরও থামেননি মাহাথির। মোদির বিরুদ্ধে একর পর এক তীর ছুড়ে যান। আর এ থেকেই ভারত-মালয়েশিয়ার বিরোধের সূচনা হয়।
পরবর্তী সময়ে এ বিরোধ রাজনীতি ও কূটনীতির সীমানা ছাড়িয়ে দুই দেশের বাণিজ্য খাতেও প্রভাব ফেলেছে। ভারত মালয়েশীয় পাম অয়েলের অন্যতম শীর্ষ ক্রেতা। বিরোধের জের ধরে ভারত সরকার মালয়েশিয়া থেকে পণ্যটির আমদানি কমিয়ে দেয়। বাড়ানো হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি। এরপর দেশীয় শিল্প রক্ষার কথা বলে অপরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করতে ৩৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সরকারের এ উদ্যোগের পেছনে মালয়েশিয়ার সঙ্গে চলমান বিরোধ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
তবে এরই মধ্যে মালয়েশিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে বিদায় নিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। ক্ষমতায় এসেছেন মুহিউদ্দিন ইয়াসিন। নতুন সরকার শুরু থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। কারণ ইয়াসিন খুব ভালো মতোই জানেন, করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলাতে রফতানিমুখী পাম অয়েল শিল্পে গতি ফেরানোর বিকল্প নেই। আর এজন্য ভারতের বাজারে হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়া জরুরি। এজন্য তিনি ক্ষমতায় এসেই কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উপায়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ নিরসনে সচেষ্ট রয়েছেন। এরই মধ্যে দিল্লিতে বিশেষ দূত পাঠানো হয়েছে। ভারত থেকে চাল আমদানি কয়েক গুণ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর ধাক্কা কাটতে শুরু করেছে। এখন সময় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের। তাই এ সময় ভারতের সঙ্গে চলমান বিরোধ নিরসনের আপ্রাণ চেষ্টা করছে কুয়ালালামপুর। আগামী দিনগুলোয় পাম অয়েলের বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। চলতি মাসের শেষ নাগাদ পণ্যটির দাম টনপ্রতি ২ হাজার ৩০০ রিঙ্গিত (স্থানীয় মুদ্রা) ছাড়াতে পারে বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়ান পাম অয়েল বোর্ড (এমপিওবি)। তবে মালয়েশিয়ার বাজারে পাম অয়েলের সর্বোচ্চ দাম টনপ্রতি ২ হাজার ৪০০ রিঙ্গিত ছাড়াবে না। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি টন পাম অয়েলের দাম ২ হাজার ২৩০ রিঙ্গিতের আশপাশে রয়েছে।
এ বিষয়ে এমপিওবির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান আহমেদ জাজলান বলেন, পাম অয়েলের বাজারে ক্ষীণ হলেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। মহামারীর ধাক্কা সামলে চীন ধীরে ধীরে আমদানি বাড়াচ্ছে। ভারতের সঙ্গেও বিরোধ নিরসনের ইঙ্গিত মিলছে। সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোয় মালয়েশীয় পাম অয়েলের বাজার পরিস্থিতি করোনা পূর্ববর্তী সময়ের মতো না হলেও বর্তমানের তুলনায় কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোয় ভারত-মালয়েশিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতির ওপর।





