লোকসমাজ ডেস্ক॥ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, সারা বিশ্বে কম-বেশি শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। সেই ঢেউ যাতে দেশে না লাগে সেদিকে নজর রাখতে হবে। তাই আইন করে হলেও পোশাক খাতের শ্রমিকদের ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি করোনাভাইরাস মহামারিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের করা কর্মহীন অসহায় মানুষের তালিকা বাতিল করার দাবিও জানানো হয়। মঙ্গলবার করোনাভাইরাসের ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন নিয়ে সিপিডি আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলেন, যে কারণে এই প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। সরকারের আর্থিক সহায়তা দিতে স্থানীয় প্রতিনিধিদের করা তালিকায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। আর্থিক সহায়তা দেয়ার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি রুখতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শও দেন তারা। করোনা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। অথচ ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ দিতে সবচেয়ে বেশি অনাগ্রহী। এ কারেণে ঋণ খেলাপিরা যেন কোনোভাবেই প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে সুবিধা না পায় তার ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে। প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়েও সারা বিশ্বে অনেক শিল্প উদ্যোক্তা শ্রমিক ছাঁটাই করছে। সেই ঢেউ যাতে দেশেও না লাগে সেদিকে নজর রাখার পাশাপাশি আইন করে হলেও পোশাক শ্রমিকদের ছাঁটাই বন্ধের সুপারিশ করেছে সিপিডি। শ্রমিকদের আয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও জানান গবেষকরা। তবে সেমিনারে পোশাক খাতের এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে সুদিন ফিরে আসবে।
সংলাপে অংশ নিয়ে গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর বলেন, খাদ্য বিতরণের যে কর্মসূচিগুলো আছে সরকারের, সেখানে চার ধাপে দুর্নীতি হয়। খাবার কেনার সময়, খাবার মজুত করার সময়, খাবার বিতরণের সময় এবং তারপর খাবার কাকে দিল বা দোকানে বিক্রি করে দিল কিনা, শেষ ধাপ যেটা, সেখানেও বিরাট কারচুপি হয়। এ সমস্যা সমাধানে সরকার থেকে সরাসরি ব্যক্তির কাছে সাহায্য পৌঁছে দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এই পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকার একটি এসএমএস নম্বর দিয়ে দিতে পারে। যেখানে বেকার হওয়া ব্যক্তি তার ন্যাশনাল আইডি নম্বরসহ এসএমএস দিয়ে জানাবেন তিনি কোথায় চাকরি করতেন। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মোবাইল নম্বর, পরিবারের সদস্যদের নাম, ন্যাশনাল আইডি অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ দেবেন। এর ফলে সরকার সহজেই ভেরিফিকেশন করে নিতে পারবে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সরকারি লোক বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার দিয়ে যে তালিকা করা হয়, সেটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এটাতে একেবারে ভূলভ্রান্তিতে ভরা। আমি আমার গ্রামের একেবারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দিয়ে বলছি, ৪২০ জনের নাম ছিল। থানা অফিসার আমাদের একজনকে ডেকে তালিকা ভেরিফাই করে দিতে বলেন। দেখা যায় ৪২০ জনের মধ্যে শুধু ৪ জন গ্রামের লোক আছেন। বাকি ৪১৬ জন সেখানে নেই এবং ওই নামে গ্রামে কোনো ব্যক্তিও নেই। পরে থানার অফিসার এটা বিশ্বাসই করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি নিজে এসে ভেরিফাই করে দেখলেন, আসলেই ৪জন আছেন। এই হলো অবস্থা। এ ধরনের তালিকা করে আমরা বেশি দূর যেতে পারব না বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘যারা নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, তাদের জন্য একটা বিশেষ প্রোগ্রাম বা প্যাকেজ করতে হবে। যার মাধ্যমে তাদের সাপোর্ট দেয়া যেতে পারে। সেজন্য একটা ফান্ড করা দরকার এবং এই বাজেটেই সেটা থাকা উচিত। আমাদের হিসাবে এসএমই খাত থেকে প্রায় ৭০ লাখ বেকার হয়ে গেছেন। লকডাউন তোলার পরে রিকশাচলকরা হয়তো রিকশাটা চালাচ্ছে, কিন্তু সেইভাবে আয় হচ্ছে না। যারা বাদাম বিক্রি করতো তারা হয়তো কাজ শুরু করতে পারে, কিন্তু আগের মতো আয় হচ্ছে না। আমাদের প্রস্তাব প্রায় দেড় কোটির মতো পরিবারকে সাপোর্ট দেয়া দরকার।
বড় শিল্পের জন্য সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের বিষয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, বড় শিল্পের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার যে ঋণ দেয়া হচ্ছে সেখানে সাবধান হতে হবে। ঋণ খেলাপীদের বাদ দেয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালকরাও বড় ঋণ গ্রাহক। এই জায়গাতেও সাবধান হতে হবে। তা না হলে এই ৩০ হাজার কোটি টাকা এরাই খেয়ে ফেলতে পারে। সে জন্য মনিটরিং কমিটি করতে হবে।
তিনি বলেন, এসএমই খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার কোটি টাকা অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগেুলোকে দেয়া হবে মাইক্রো ক্রেডিট ফাইন্যান্সের মাধ্যমে। সেটা ঠিক আছে। এই টাকা বাদ দিয়ে যেটা থাকবে তা এসএমই খাতের জন্য পর্যাপ্ত না। এখানে প্রায় ৭০-৮০ লাখ লোক কাজ করে এবং একটা বিশাল জনগোষ্ঠী। অল্প অল্প করে অনেক টাকা লেগে যায়। এই জায়গায় সরকারকে আর একটু উদার হতে হবে আগামীতে। ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে শুরু করা হোক, কিন্তু পরবর্তীতে হয়তো টাকার অংক বাড়াতে হবে। সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা ঠিকমতো বিতরণ হচ্ছে কি-না, তা মনিটরিং করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকার্স এবং কিছু ট্রেডবডি নিয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করার পরামর্শ দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, প্রতিটি সেক্টরে ঋণের প্রবাহটা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তা মাসিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে। টাকা বিতরণ না হলে কোথায় সমস্যা? কোন সেক্টরে সমস্যা? তা নির্ণয় করে, সেখান থেকে উত্তরণের দায়িত্ব হবে এই কমিটির। আমি মনে করি, যতদ্রুত সম্ভব এটা করা দরকার।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক জানান, চীনের ওপর ইউরোপ-আমেরিকা নাখোশ হওয়ায়, তৈরি পোশাক শিল্পের অনেক অর্ডার বাংলাদেশে চলে আসবে। করোনায় চীনের পর আক্রান্ত হয় ইউরোপ-আমেরিকা। দেশের তৈরি পোশাক খাতের মূল গন্তব্যও এ দুই মহাদেশের বিভিন্ন দেশ। গত কয়েক মাসে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি কমতে কমতে নেমেছে তলানিতে। তবে ইতিমধ্যে কিছু নতুন অর্ডারে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। তিনি বলেন, সব যদি ঠিকঠাক থাকে, আগামী ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে আমরা আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারব এবং কপাল ভালো থাকলে আমরা আগের থেকেও ভালো করতে পারি। তবে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গার্মেন্টগুলোকে টিকিয়ে রাখা। কারণ যদি কারখানা চালু না থাকে, তাহলে আমার সুযোগ তেরি হলেও কোনো বন্ধ কারখানায় কেউ অর্ডার দেবে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, গার্মেন্টসের জন্য সরকারের প্যাকেজ যে মেকানিজমে তৈরি হয়েছে, এটা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত অন্য কারও হাতে এই টাকা যায়নি। সরকার যে প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তা খুবই ভালো একটা প্যাকেজ গার্মেন্ট খাতের জন্য। এর জন্য অন্তত কারখানা চালু রাখা গেছে। কিন্তু আগামী এক-দেড় মাস পর কী হবে সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন আছে। এটা নির্ভর করছে আমরা অর্ডার কী পরিমাণে পাই এবং তারপর সহায়তা কী পরিমাণ লাগবে।





