মহামারীর মধ্যে ১৭ মাসের সর্বনিম্নে খাবারের দাম

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ২০২০ সালের শুরুটা হয়েছিল বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। তবে বছরের দ্বিতীয় মাসেই খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দামে ধস নামতে শুরু করে। কমতে কমতে গত এপ্রিলে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) ফুড প্রাইস ইনডেক্স বা খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক কমে এক বছরের বেশি সময়ের সর্বনিম্নে চলে আসে। আর মে মাসে তা আরো কমে ১৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে দাঁড়িয়েছে। খবর এফএও।
চলতি বছরের মে মাসে এফএও খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৬২ দশমিক ৫ পয়েন্টে, এপ্রিলের তুলনায় যা ৩ দশমিক ১ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ কম এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে সর্বনিম্ন মাসভিত্তিক সূচক। গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে ধারাবাহিকভাবে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক কমতির দিকে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধি এর পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। মহামারী রোধে দেশে দেশে নেয়া সরকারি পদক্ষেপগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শীথিল করে আনছে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের ভোক্তা সংখ্যা কমছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে দাম। তবে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম কমতির দিকে থাকলেও মে মাসে গত তিন মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো চিনির দাম বেড়েছে।এফএওর ফুড প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী, মে মাসে খাদ্যশস্যের গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৬২ দশমিক ২ পয়েন্টে, আগের মাসের তুলনায় যা ১ দশমিক ৬ পয়েন্ট বা ১ শতাংশ কম এবং ২০১৯ সালের একই মাসের প্রায় কাছাকাছি।
এ সময়ে চাল বাদে বেশির ভাগ খাদ্যশস্যের দামে মন্দা ভাব বজায় থাকতে দেখা গেছে। মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্য আগের মাসের তুলনায় ১ শতাংশ বেড়েছে। বাসমতি চালের দাম বাড়ার কারণে পণ্যটির সামগ্রিক দাম বেড়েছে। এদিকে এপ্রিলে কিছুটা বাড়তির দিকে থাকলেও গত মাসে গমের দাম ফের নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। এ সময়ে আগের মাসের তুলনায় খাদ্যপণ্যটির দাম কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। নতুন মৌসুমে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড গম উৎপাদনের পূর্বাভাস দিয়েছে বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। ফলে বাজারে পণ্যটির সরবরাহ নিশ্চয়তা বেড়েছে, যা দাম কমাতে প্রভাব ফেলেছে।এদিকে ভুট্টা বাজারে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত ভুট্টার দামে চার মাস ধরে মন্দা ভাব বজায় থাকার পর মে মাসেও দাম কমেছে। গত মাসে পণ্যটির দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমপক্ষে ১৬ শতাংশ কমেছে। বৈশ্বিক মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর পাশুখাদ্য ও বায়োডিজেল উৎপাদন খাতে কৃষিপণ্যটির চাহিদা ব্যাপক হারে কমেছে, যা পণ্যটির দামে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
এদিকে মে মাসে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে ভোজ্যতেলের দামে। গত মাসে পণ্যটির বৈশ্বিক মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১২৮ দশমিক ১ পয়েন্ট, আগের মাসের তুলনায় যা ৩ দশমিক ৭ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৮ শতাংশ কম। এর মাধ্যমে পণ্যটির দাম কমে ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। সরিষা ও সূর্যমুখী তেলের দামে চাঙ্গা ভাবের পরও টানা চার মাস ধরে ভোজ্যতেলের দাম কমার পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে পাম অয়েলের দামের ব্যাপক দরপতন।
মে মাস নিয়ে টানা পাঁচ মাস ধরে পাম অয়েলের দাম ক্রমান্বয়ে কমছেই। প্রত্যাশার তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধির বিপরীতে বৈশ্বিক আমদানি চাহিদা হ্রাস ও প্রধান রফতানিকারী দেশগুলোয় মজুদ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যটির দাম কমিয়ে আনতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। তবে এ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে রফতানি কমে আসা ও কৃষ্ণ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে পণ্যটির রফতানি বন্ধ বা সীমিত করে আনায় সরিষা ও সূর্যমুখী তেলের দামে উল্লম্ফনের দেখা মিলেছে।এদিকে টানা তিন মাস নিম্নমুখী রয়েছে দুগ্ধপণ্যের বৈশ্বিক বাজার। মে মাসে এফএওর মূল্যসূচকে পণ্যটির পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ১৮১ দশমিক ৮। আগের মাসের তুলনায় পণ্যটির দাম কমেছে ১৪ দশমিক ৪ পয়েন্ট বা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কম। এ সময়ে মাখন ও পনিরের দামে খাড়া পতনসহ প্রায় সব ধরনের দুগ্ধপণ্যের গড় মূল্যসূচক ছিল নিম্নমুখী। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ সময়ে স্বাভাবিকভাবে দুগ্ধপণ্যের দাম কিছুটা কমতির দিকে থাকে। কারণ এ সময়ে পণ্যটির মূল মৌসুম চলায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায়। এর ওপর এবার নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ পড়েছে। ইউরোপসহ বৈশ্বিক পরিসরে মাখনের উদ্বৃত্ত সরবরাহ বেড়েছে। এছাড়া ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে পানিরের রফতানি বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। তবে পণ্যটির আমদানি চাহিদা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। ফলে মাখন ও পনিরের দাম অপ্রত্যাশিতভাবে কমেছে। কিন্তু তুলনামূলক কম কমেছে ননিযুক্ত ও ননিমুক্ত গুঁড়ো দুধের দাম। এর পরও দাম কমতির দিকে থাকায় এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় চীনের কিছু ব্যবসায়ী গুঁড়ো দুধ রফতানি বাড়িয়েছেন, যা পণ্যটিকে বড় ধরনের দরপতন থেকে রক্ষা করেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
একই পরিস্থিতি বজায় রয়েছে আমিষপণ্যের বাজারে। এ নিয়ে টানা পাঁচ মাস নিম্নমুখী রয়েছে পণ্যটির বাজার। এফএওর ফুড প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী, মে মাসে আমিষজাতীয় পণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৬৮ পয়েন্টে, আগের মাসের তুলনায় যা ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট বা দশমিক ৮ শতাংশ কম। ২০১৯ সালের একই মাসের তুলনায় পণ্যটির মূল্যসূচক কমেছে ৬ দশমিক ৩ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর বিশ্ববাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে লকডাউনের কারণে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা কমেছে দৈনিক গড়ে তিন কোটি ব্যারেল। এতে জ্বালানিটির দাম কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের আমিষ আমদানিতে মন্দা ভাব বিরাজ করছে। অন্যদিকে ব্রাজিলসহ শীর্ষ রফতানিকরাক দেশগুলোর বাজারে আমিষের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দাম কমতির দিকে রয়েছে।
তবে গত মাসে ব্যতিক্রম ছিল বৈশ্বিক চিনির বাজার। এর আগে দীর্ঘদিন মন্দায় থাকা পণ্যটির বাজার এপ্রিলে এসে আরো নিম্নমুখী হয়েছে। তবে পরের মাসেই পণ্যটির বাজারে চাঙ্গা ভাব ফিরেছে। মে মাসে এফএওর মূল্যসূচকে চিনির গড় পয়েন্ট এপ্রিলের তুলনায় ১০ দশমিক ৭ পয়েন্ট বা ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে একলাফে ১৫৫ দশমিক ৬ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। মূলত প্রত্যাশার তুলনায় চিনির বৈশ্বিক উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ। বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী ভারত ও দ্বিতীয় শীর্ষ রফতানিকারী থাইল্যান্ডে চলতি মৌসুমে পণ্যটির উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যেতে পারে।
ইন্ডিয়ান সুগার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (আইএসএমএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ বিপণনবর্ষের শুরু থেকে ১৫ মে পর্যন্ত ভারতের চিনিকলগুলোয় সব মিলিয়ে ২ কোটি ৬৯ লাখ টন চিনি উৎপাদন হয়েছে, আগের বর্ষের একই সময়ের তুলনায় যা ৬১ লাখ টন বা প্রায় ২০ শতাংশ কম। প্রতি বছরের অক্টোবরে দেশটিতে চিনির বিপণনবর্ষ শুরু হয়, যা শেষ হয় পরের বছরের সেপ্টেম্বরে।
এছাড়া চিনির দাম বাড়ার পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বাড়তি ইথানল উৎপাদনের ঝোঁক। তুলনামূলক লাভজনক হওয়ায় চিনির পরিবর্তে বিশ্বের শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশ ইথানল উৎপাদনে ঝুঁকেছে। এতে পণ্যটির উৎপাদন কমতে কমতে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা পণ্যটির দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।