৩৯ চিকিৎসালয়ে তরল অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপন তালিকায় যশোরের নাম না থাকায় ক্ষোভ

আকরামুজ্জামান ॥ কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দেশের ৩৯টি সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ওই তালিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও বাগেরহাটের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের নাম থাকলেও নাম নেই দেশের সুপ্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জেলার হাসপাতালের নাম না থাকায় এ নিয়ে যশোরের রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতির জন্য তারা এ জেলার শীর্ষ জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহেলা ও ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন।
গত ২ জুন সরকারের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ লিক্যুইড অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপনের জন্য ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড ওয়ার্ক ট্রেনিং সেন্টারকে চিঠি দেয়। এসময় ৩৯টি সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নামও উল্লেখ করে দ্রুত এসব হাসপাতালে নিরবিচ্ছিন্ন লিক্যুইড গ্যাস ট্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়। ওই তালিকায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও বাগেরহাট ২৫০ শয্যা হাসপাতালের নাম থাকলেও নাম নেই যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের। অথচ গত ৮ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত এ জেলায় একজন করোনা রোগীর মৃত্যুসহ মোট ১৩১ জন মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। করোনা সংক্রমণের উচ্চতর ঝুঁকিতে থাকা এ জেলার গুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালটিতে অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপনের তালিকায় নাম আসায় যশোরে সর্বত্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, যশোর ২৫০ জেনারেল হাসপাতাল শুধু যশোরের নয়, গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ববহণ করে আসছে। এ হাসপাতালে অত্যাধুনিক করোনারি কেয়ার ইউনিট থাকায় যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার রোগীরা এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। তাছাড়া ভৌগলিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এ জেলার গুরুত্ব অপরিসীম। এ জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর রয়েছে। সবদিক বিবেচনায় যশোরের গুরুত্ব অন্য জেলার চেয়েও অনেক উঁচু অবস্থানে রয়েছে। অথচ করোনা সংক্রমণের এই চরম ক্রান্তিকালে যশোর জেলার গুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালটিকে তালিকায় না রেখে মাগুরা, চূয়াডাঙ্গা ও বাগেরহাট ২৫০ শয্যা হাসপাতালকে স্থান দেয়া হয়েছে। যা খুবই দুঃখ ও হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন এ জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ।
এ বিষয়ে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক যশোর উন্নয়নের কারিগর হিসেবে খ্যাত সাবেক মন্ত্রী মরহুম তরিকুল ইসলামের তনয় অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, একটি অনির্বাচিত সরকার জনগণের ভালো মন্দ বিবেচনায় না নিয়ে তাদের সকল কাজ খেয়াল খুশিমত করবে এটিই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনি বলেন, যশোর হচ্ছে খুলনা বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত এলাকা। যশোর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্র বিন্দু। এখানে বিমানবন্দর রয়েছে, বৃহত্তম স্থলবন্দর রয়েছে। এ জেলা দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মানুষ যাতায়াত করে থাকেন অথচ সেই জেলা বিবেচনায় না নিয়ে তার পার্শ্ববর্তী মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, বাগেরহাট জেলাকে বিবেচনায় নেয়া হলো। তিনি বলেন, এসব জেলাকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। সেখানকার মানুষও উন্নত চিকিৎসা পাক আমি চাই। কিন্তু অত্যন্ত বোধগম্য যে মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, বাগেরহাট কেনো বিবেচনায় নেয়া হয় অথচ যশোর নেয়া হয় না। সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা যদিও অনির্বাচিত তারপরও তারা তাদের জনগণের প্রতি যতটা দায়বদ্ধতা আছে সে তুলনায় দুর্ভাগ্য যশোরের সংসদ সদস্যদের এ জেলার জনগণের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা নেই। থাকলে অন্তত তারা এ জেলার নাম অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করতো বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমি এখনও বিশ্বাস করি যশোরের যারা জনপ্রতিনিধি আছেন। তারা এখনও আন্তরিক হয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করলে যশোরের নাম অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। তারা যশোরের মানুষের জন্য এ কাজটি করবেন বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
তালিকায় যশোর জেলার নাম না থাকাকে খুবই দুঃখজনক ও হতাশাজনক বলেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্সপার্টি (মার্কসবাদী)’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ। তিনি বলেন, এ ব্যর্থতার জন্য জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও সরকার দলের জনপ্রতিনিধিরা দায়ভার এড়াতে পারেন না। তাদের ব্যর্থতার কারণেই যশোরের মানুষ এমন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন। তারা যদি এটি সঠিকভাবে অ্যাড্রেস করতে পারতেন তাহলে এ জেলার নাম কোনপ্রকার বাদ যেতে পারে না। আমাদের দলের পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, শুধু তরল অক্সিজেন ট্যাংক নয়, জেলার করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর জরুরি ভিত্তিতে স্থাপনের জন্য আমরা দাবি করে আসছি। এ বিষয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলে তিনি জানান। জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সদস্য অ্যাডভোকেট রবিউল আলম বলেন, দেশে যেসব এলাকায় করোনা সংক্রমণ বেশি সেখানে সরকার তরল অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু যশোর সংক্রমণের দিক থেকেতো অনেক এগিয়ে। অথচ এ জেলার নাম না থাকাটা খুবই দুঃখজনক। এটি আমাদের দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণেই সম্ভব হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যে কতটা দুর্বল তা করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ফলে এ বিষয়ের জন্য জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যর্থতা রয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তিনি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি আহবান জানান। এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবু শাহীন বলেন, বিষয়টি পুরোপুরি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের। তিনিই তার হাসপাতালের কী প্রয়োজন সে বিষয়ে আবেদন করবেন। আমার বিশ্বাস যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারবেন। এ বিষয়ে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আরিফ আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারাদেশের ৩৯টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সরকারি হাসপাতালে লিক্যুইড অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়টি আমার জানা নেই। ফলে এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলতে পারবেন। বিষয়টি নিয়ে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দিলীপ কুমার রায়ের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, যশোরের নাম এই তালিকায় কী কারণে নেই সে বিষয় আমি কিছু বলতে পারবো না। তবে আমাদের হাসপাতালের জন্য অক্সিজেন প্ল্যান্ট বরাদ্দ হয়েছে। যা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পাওয়া যাবে।

ভাগ