৫০ ভাগ নম্বরে পরীক্ষা নেওয়াকে ‘মস্ত ভুল’ বলেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

আমিরুল আলম খান
করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সারা দুনিয়াকে থামিয়ে দিয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবন এখন ঘরবন্দি। যেটুকু সচল আছে তাও নানা বেড়াজালে বাঁধা। মনে ভয়, সামান্য চলালচলে বাঁধা তো আছেই। গরুর ঠুঁসির মত মুখোশ পরে, হাতে গ্লাভস পরিয়ে কাজ করায় অনভ্যস্ত দুনিয়ার ৯০ ভাগ মানুষ। এর সাথে যাদের প্রটেক্টিভ গিয়ার, নিদেন পে পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্ট পরে কাজ করতে হচ্ছে তাদের বিড়ম্বনা সীমাহীন। প্রচণ্ড গরমে রীতিমত দমবন্ধ হবার জোগাড়। এদিকে যারা এয়ারকন্ডিশন ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারে না, তাদের অস্বস্তির সীমা নেই।
সারা দুনিয়ায় অর্থনীতির চাকা বন্ধ। কিন্তু তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে জনস্বাস্থ্য। জীবন ও জীবিকা একেবারে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। আর তাতে অর্থশাস্ত্রী আর চিকিৎসাশাস্ত্রীরা ভাগ হয়ে গেছেন দুই মেরুতে। শিা ইস্যু বেশ পেছনে চলে গেছে। কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হলেই প্রথম কোপ পড়ে শিার ওপর। শিশু আর বৃদ্ধরা যেহেতু সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে, তাই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সাথে দেশে দেশে সবার আগে বন্ধ করা হয়েছে শিালয়গুলো। সেটি একান্ত জরুরি ছিল। কিন্তু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার গতি কবে কমবে তার হদিশ পাচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা। পয়লা দিকে কিছু আশাবাদ শোনানো হলেও বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন কোভিড-১৯ শুধু যে বহুকাল আমাদের চোখ রাঙাবে তাই নয়, হতে পারে সর্দি- কাশির মত কোভিড-১৯ এর সাথেই মানুষকে বসবাস করতে হবে। তবে তারা আশাবাদী যে, কোভিড-১৯-এর গলায় তারা শেকল পরাতে পারবেন এবং এখন যেভাবে তা চোখ রাঙাচ্ছে আর গিলে খাচ্ছে লাখ লাখ মানুষের জীবন তার লাগাম টানা হয়ত সম্ভব হবে।
কিন্তু সে জন্য কত কাল অপো করতে হবে কেউ ঠিক জানেন না। এ রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ নামক চিন্তাশীল ও বুদ্ধিমান প্রাণীর আশরাফুল মুখলুকাত হয়ে ওঠার গোপন রহস্য যে শিা সেটাই এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। সোজা কথায় মানব সভ্যতার আসল বুনিয়াদ যে শিা সেটিই এখন সবচেয়ে বেশি অচল, নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসে দুনিয়া জুড়ে একযোগে শিা ব্যবস্থা এমন সংকটে আগে কখনো পড়েনি। অবশ্য আঞ্চলিক বা স্থানিকভাবে শিা এমন অসংখ্য সংকটের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায়। যুদ্ধবিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, দুর্ভিে শিা এ রকম সংকটের শিকার হয় হামেশাই। মহাযুদ্ধের সময়ে দু দুবার চার-পাঁচ বছর করে শিা ব্যবস্থা কোথাও না কোথাও অচল হয়ে পড়েছেই। বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে ঢের বেশিকাল ধরে চলেছে ভিয়েতনামের ওপর আমেরিকার আগ্রাসন। শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ায় যুদ্ধ চলছে দশকের পর দশক ধরে। প্যালেস্টাইনে ১৯৪৮ সাল থেকেই যুদ্ধ জারি আছে। কাশ্মীরেও তাই। নয় মাস চলেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। এসব সময়ে শিা তির শিকার হয়েছে, অবকাঠামো ব্যাপক ধ্বংসের শিকার হয়েছে, নিশ্চল হয়ে পড়েছে শিা পরিকাঠামো।
এবারের সংকট ভিন্ন মাত্রিক। ভাইরাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চলছে, তাতে শিা পরিকাঠামো নিশ্চল হয়ে পড়েছে বটে, কিন্তু অবকাঠামো ধ্বংস হয়নি। যদিও অবকাঠামো রাণাবেণ ও নতুন নির্মাণ থমকে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় তির মুখে শিার মূল কাজ পঠন-পাঠন পড়েছে মহাসংকটে। প্রযুক্তির সহায়তায় বিশ্বের অনেক দেশ অবশ্য এই সংকট মোকাবিলা করছে এবং তির পরিমাণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু আধুনিক যুগে শিা যত না বই নির্ভর তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব পরীানিরীা, বহিরাঙ্গণ কর্মসূচি ও ল্যাবনির্ভর। স্বীকার করতেই হবে, করোনাভাইরাস সে ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও কারগরি শিার মত হাতেকলমে ও ল্যাবনির্ভর শিা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে শিাব্যবস্থা যে সংকটে পড়েছে তা দুনিয়ার অন্য দেশের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। সে ভিন্নতা ধরনে ও মাত্রায়। বাংলাদেশে শিার মূল সমস্যা শিার ল্য, উদ্দেশ্য নির্ণয়ে বিপুল ব্যর্থতা। এদেশের শিাক্রম (কারিকুলাম) অস্পষ্ট ও লহীন। তাই শিাক্রমের ল্য অর্জনে পাঠক্রম (সিলেবাস) বিন্যাসেও ত্রুটির কূলকিনার নেই। আছে বিদ্যালয় পরিচালনায় ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি নানা সংকট। উপযুক্ত শিক তৈরির উদ্যোগের অভাব। কোনো কোনো েেত্র তা অনুধাবন করার মতা ও ইচ্ছার অভাব প্রকট। করোনাকালে এসব সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে আরেকটি বড় সমস্যা শিা মূল্যায়ন ব্যবস্থায়। এ ব্যবস্থা এতই সেকেলে এবং কোনো কোনো েেত্র এমন সব ইগো পরিচালিত যে, সে সব সমস্যা সমাধানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বনের পরামর্শ দানের পথ পর্যন্ত বন্ধ। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় অন্যান্য দেশ যেসব সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ নিচ্ছে দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা তা করতে পারছি না। করোনাকালে শিা সচল রাখতে অনেক দেশই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। দূরশিণের নানা উপায় এখন মানুষের হাতের নাগালে। এর বেশির ভাগই অনলাইনভিত্তিক। কিন্তু বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তি যতখানি বাণিজ্যবান্ধব ততখানি জনশিাবান্ধব নয়। শিায় দূরশিণ কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় যে আশার আলো জ্বেলেছিল প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্যের বিদায়ের পর তার উন্নয়ন তো দূরের কথা, সেটি এখন ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। অথচ সারা পৃথিবীতে দূরশিণ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। ১৯৯০ দশকে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সে ধারা অব্যাহত রাখা হলে আজকের দুর্যোগ মোকাবিলায় তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারত। কিন্তু আমাদের অদূরদর্শী রাজনীতির কোপানলে সে সুযোগ ধ্বংস হয়েছে।
গত এক দশকে শিােেত্র এমন বহু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যা আমাদের শিাব্যবস্থাকে নিঃসম্বল করে ফেলেছে। এর মধ্যে প্রধান হল শিার অবাধ বাণিজ্যিকীকরণ। সেটা সর্বপ্লাবী হয়েছে বেঞ্জামিন ব্লুমের টেক্সোনমির অপব্যাখ্যা করে তথাকথিত সৃজনশীল শিার নামে শিাকে কোচিং সেন্টারের একচেটিয়া বাণিজ্যের কাছে বন্ধক দিয়ে। ফলে দেশে শিালয়গুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। শিক সম্প্রদায় পেশাজীবী হিসেবে সামাজিক মর্যাদা হারিয়েছেন। সবচেয়ে বড় তি হয়েছে শিকের দতা কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। ফলে শিার মানের ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। গত এক দশকে শিা হয়ে উঠেছে পরীানির্ভর। দুটো একেবারেই অনাবশ্যক ও শিশুনির্যাতনমূলক পরীা (প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি) চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে শিশু, অভিভাবক ও শিকদের কাঁধে। এই অতিরিক্ত বোঝা থেকে জাতির মুক্তি চেয়ে নাগরিকদের সকল আবেদন নিবেদন মামলা মোকদ্দমা কোনই কাজে আসেনি।
পাঠক, মনে হতে পারে, আমি ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি। পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটাঘাঁটি করছি। জ্বি, ঠিক তাই। এসব কাসুন্দি না ঘেঁটে করোনাকালে শিার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব। তাই, আমি মনে করি, শিা সম্পর্কে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার এখনই সময়।
প্রথমত, সরকারের প থেকে মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে প্রাথমিক ও জেএসসি/জেডিসি পরীা তুলে দেবার স্পষ্ট ঘোষণা করা উচিত।
শিা কার্যক্রম চালু রাখার স্বার্থে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দ জনশক্তি, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সুবিধা কাজে লাগানো এবং তার দ্রুত আধুনিকায়ন ও উন্নতির পদপে নেওয়া জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এজন্য শিা প্রশাসনের শীর্ষপদে যোগ্যতম লোক নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। শিক বাতায়নকে আরও কার্যকর করা এবং ডিজিটাল কন্টেন্টগুলোর ব্যাপক উন্নতি সাধন করা আশু প্রয়োজন। আমরা ল্য করেছি, শিক বাতায়নে অনেক কন্টেন্ট ভয়াবহ রকম যান্ত্রিক ও প্রাণহীন। সংসদ টেলিভিশনের সম্প্রচার শুধুমাত্র ক্যাবলভিত্তিক না রেখে তা বিটিভির সাথে টেরিস্টেরিয়াল প্রযুক্তিতে সম্প্রচার করার জরুরি পদপে নেওয়া দরকার এখনই। শিা মন্ত্রণালয় ও এ-টু-আই যৌথভাবে শিা এয়ার উদ্ভাবন ও তার মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে পারে। সুখের কথা, এ-টু-আই ইতোমধ্যে তেমন একটি ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে অনুষ্ঠানে যা দেখেছি তা অনেকখানি প্রাণহীন এবং তাত্ত্বিক। এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। দেশের সকল শিার্থীর ডাটাবেজ তৈরি করে প্রত্যেক শিার্থীকে মোবাইল নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসা এবং তাদের জন্য নামমাত্র মূল্যে বিশেষ ডাটা প্যাকেজ ঘোষণা করা। এ বিষয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার এখনই সুযোগ। সর্বোপরি, স্থগিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীা গ্রহণ এবং ২০২১ সালের মাধ্যমিক পরীা সম্পর্কে সরকারে চিন্তাভাবনা প্রকাশ করা। এ বিষয়ে একটি কথা বলা প্রয়োজনীয় বোধ করছি। ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে শিা বিষয়টি দেখভাল করতেন সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। কিন্তু তার সাথে কোনো আলোচনা না করেই সে সময়ের শিামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী সংপ্তি সিলাবাসের নামে ৫০ ভাগ নম্বরে পরীা নেওয়ার ঘোষণা করেন। তার সাথে যুক্ত হয় গণটোকাটুকি। এ ঘটনাকে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর স্মৃতিকথায় একটা ‘মস্ত ভুল সিদ্ধান্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৭২ সালের ভুল পথে হাঁটার দিকেই বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিরা বেশি উৎসাহী বলে খবর আসছে। একই ভুল দ্বিতীয়বার করলে তার যে মাসুল দিতে হবে তা আমরা কখনও পূরণ করতে পারব না। বরং বুদ্ধিমানের কাজ হবে বিপর্যস্ত শিা মূল্যায়নে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাওয়া ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা ও গৃহীত পদপে সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। শিার মান নিয়ে আপস করা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এবার যেন সেই ভুল না করি। আরেকটি কথা। নতুন কারিকুলাম তৈরি করা হচ্ছে। তা চালুর আগেও নবম ও দশম শ্রেণিতে মাধ্যমিক এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীা গ্রহণের ব্যবস্থা পুনরায় চালু করায় কোনো বাঁধা থাকার কথা নয়। শিা বোর্ডগুলোর সে সামর্থ্য ষোলো আনাই আছে।
আমিরুল আলম খান, যশোর শিা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান
ভাগ