চৌগাছায় মমিন বাহিনীর হামলায় ‘কিলার’ শামীম আহত, উত্তেজনা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোর চৌগাছার শীর্ষ সন্ত্রাসী যুবলীগ নেতা শামীম কবির ওরফে কিলার শামীম প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছে। গত ২৪ মে রোববার রাতে পৌর এলাকার কুঠিপাড়া মোড়ে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগের দিন (রোববার) রাত সাড়ে ১১ টার দিকে সন্ত্রাসী শামীমের নেতৃত্বে একটি বাহিনী চৌগাছার বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী নব্য আওয়ামী লীগ নেতা পুলিশ কর্মকর্তার পদ হতে চাকুরিচ্যুত জসিম উদ্দিনের ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার ও বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল নিয়ে কুঠিপাড়া মোড়ে অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী মমিনের ওপর হামলা করতে আসে। বিষয়টি মমিনের বাহিনী টের পেয়ে গেলে তারা শামীম বাহিনীর ওপর পাল্টা হামলা চালায়। এতে শামীম বাহিনীর প্রধান শামীম কবির ওরফে কিলার শামীম গুরুতর আহত হয়। পাশাপাশি মমিন বাহিনীর সদস্য কুঠিপাড়া এলাাকার আজানুর রহমানের ছেলে মিলন হোসেনও আহত হয়। পরে এলাকাবাসী আহতদের উদ্ধার করে চৌগাছা হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আহতদের ওই রাতেই যশোর সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। এ ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
একাধিক সূত্র জানায়, নব্বই এর দশকে চৌগাছা তথা যশোরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বনে যায় মমিন-শামীম বাহিনী। তারা ছিল একে অপরের পরম বন্ধু। কিন্তু বিশেষ একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে দুই বন্ধু হয়ে যায় পরম শত্রু। বছরের পর বছর বলা চলে কেউ কারো মুখ পর্যন্ত দেখে না। শামীম দীর্ঘদিন জেলের ঘানি টানলেও রাজনৈতিক শেল্টার পেয়ে জেল থেকে বের হয় মমিন। উপজেলা আওয়ামী লীগের গ্রুপিং রাজনীতিতে মমিন এক গ্রুপের শেল্টার নিয়ে যুবলীগ নেতা বনে যায়। এমপি, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতার সাথে তার দহরম মহরম গড়ে উঠে। গোটা চৌগাছায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে সে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের অপর গ্রুপ চেষ্টা চালাতে থাকে শামীমকে জেল থেকে মুক্ত করার এবং তারা সফলও হয়। শামীম জেল থেকে বের হয়ে নিজ গ্রাম চৌগাছা উপজেলার গরীবপুরে অবস্থান করতে থাকে। পাশাপাশি কে কোথায় আছে, কার অবস্থান কী খোঁজ নিয়ে কাজ করতে থাকে। সম্প্রতি পুলিশ অফিসার থেকে চাকুরিচ্যুত, বিতর্কিত ব্যবসায়ী, নব্য আওয়ামী লীগ নেতা ফারহানা টাওয়ারের মালিক জসিম উদ্দিনের সাথে কিলার শামীমের সখ্য গড়ে উঠে। সূত্র জানায়, পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগের দিন অর্থাৎ চাঁদ রাতে কিলার শামীম ও জসিমের নেতৃত্বে অপর বাহিনী প্রধান মমিনকে হত্যার উদ্দেশ্যে তারা কুঠিপাড়া মোড়ে অবস্থান নেয়। কুঠিপাড়া মোড় হচ্ছে মমিন বাহিনীর নিজের এলাকা বলে পরিচিত। শামীম তার বাহিনী নিয়ে কুঠিপাড়া মোড়ে অবস্থান নিয়েছে এটি টের পেয়ে মমিনের নেতৃত্বে তার বাহিনী আচমকা শামীম বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এতে জসিমসহ বাহিনীর অন্যরা পালাতে পারলেও ধরা খায় বাহিনী প্রধান কিলার শামীম। তাকে লাঠি দিয়ে বেদম মারপিট করে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায় মমিন বাহিনী। এদিকে বাহিনী প্রধান শামীম গুরুতর আহত হলেও বিতর্কিত ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের গায়ে কোন নখের আঁচড় লাগেনি, এ নিয়েও চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। জসিম অনুসারী এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২৪ মে সকাল থেকেই শামীম ও জসিম তাদের লোকজন এক সাথে সময় পার করে। সন্ধ্যার দিকে তারা ভরপুর মদ সেবন করে। এরপর রাত সাড়ে ১১ টার দিকে তারা মমিনের ওপর হামলা করতে যায়। এখানে প্রশ্ন, বাহিনী প্রধান শামীম প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হলেও জসিম কীভাবে অক্ষত থাকে? তাহলে কি শামীমের ওপর হামলার ঘটনায় জসিমের হাত রয়েছে? এমন প্রশ্ন এখন শামীম বাহিনীসহ তার অনুসারীদের মাঝেও ঘুরপাক খাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ১৯৯৬ সালে যশোর সদর উপজেলার বারীনগরে (সাতমাইল) মিয়া বাহিনীর প্রধান মোখলেছুর রহমান নান্নু ওরফে কিলার নান্নুর তত্ত্বাবধানে চৌগাছায় শামীম-মমিন বাহিনী গড়ে উঠে। এই বাহিনী রাতকে দিন আর দিনকে রাত করে গোটা চৌগাছা উপজেলাকে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করে। মমিন-শামীম বাহিনীর প্রথম শিকার হন উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মকবুল হোসেন। ১৯৯৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নিজ বাড়িতে তাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে এই বাহিনী। সন্ত্রাসীরা বিএনপির এই নেতাকে হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, এই সন্ত্রাসীদের শেল্টারদাতা উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার নির্দেশে বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। বিভিষিকাময় সেই হত্যার রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতে ১১ এপ্রিল মমিন-শামীম বাহিনী হত্যা করে যুবদল নেতা শহিদুল ইসলামকে। বেড়গোবিন্দপুর বাওড়ে তার বুকে ও পেটে ৫২ স্থানে ধারালো চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে তারা। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে শামীম পাড়ি জমায় পার্শবর্তী দেশ ভারতে। অপর সন্ত্রাসী মমিনও চলে যায় আত্মগোপনে। মাঝে মধ্যে তারা দেশে খুব কম সময়ের জন্য একত্রিত হতো। এরই মধ্যে একটি মেয়েলি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মমিন-শামীমের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, যা আজও বিদ্যমান। মমিন তার নিজের মত বাহিনী গড়ে তোলে। অপরদিকে শামীমও গড়ে তোলে নিজ বাহিনী। ২০১২ সালে চাঁদার দাবিতে শামীম বাহিনীর হাতে নির্মম হত্যার শিকার হয় চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র সৌরভ। ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর একই বাহিনীর হাতে নির্মম হত্যার শিকার হন যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সিংহঝুলী ইউপি চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান মিন্টু। মমিন-শামীম অসংখ্যবার গ্রেফতার হয়েছে, কিন্তু আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে তারা পুনরায় বের হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অব্যহত রেখেছে। এদিকে ঈদের আগের রাতে হামলায় ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোন সময় উভয় বাহিনী বড় ধরনের সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

ভাগ