মুকুরুল ইসলাম মিন্টু, চৌগাছা (যশোর) ॥ যশোরের চৌগাছায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। সড়কের ওপর গাছ ভেঙ্গে পড়ায় বৃহস্পতিবার প্রায় সারাদিনই চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গত বুধবার দুপুর থেকেই সীমান্তবর্তী উপজেলা চৌগাছায় শুরু হয় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডব। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির সাথে বয়ে যেতে থাকে দমকা হাওয়া। সময়ের সাথে বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া বাড়তে থাকে। আবহাওয়া খারাপ দেখে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ দুপুর থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। সন্ধ্যা সাতটার পর হতে বাতাসের গতিবেগ কয়েকগুন বেড়ে যায়। সেই সাথে মুষলধারে বৃষ্টিপাত। বাতাসের গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে, ঘরের ওপর থাকা এক হাজার লিটার পানির ট্যাংকি আছড়ে নিচে পড়ে। টিনের ঘরবাড়ি মিশে যায় মাটির সাথে। অধিকাংশ ঘরের টিন উড়ে যায়। সড়ক, বসতবাড়ি ও মাঠঘাটে লাগানো বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালি ভেঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। বাতাসের তান্ডবলীলা চলে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত। গাছ চাপায় মৃত্যু হয় মা ও মেয়ের।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তা-বে গোটা চৌগাছাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বয়োবৃদ্ধরা জানান, তারা কখনও এমন ঝড়-বৃষ্টি দেখেননি। ঝড়ে শত শত বিঘা জমির উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকের যে পরিমান ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে নি¤œ ও নি¤œ মধ্যবিত্ত শ্রেনীর মানুষজন। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা নিজের অথবা বর্গা নিয়ে মাঠে বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ করেছিলেন। কিন্তু ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে তাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। পাঁচনামনা গ্রামের কৃষক লোকমান হোসেন জানান, তিনি চলতি মৌসুমে ৪ বিঘা জমিতে কলা ও দেড় বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেন। কিন্তু সব ফসল ঘুর্ণিঝড়ে শেষ হয়ে গেছে। বেড়বাড়ি গ্রামের কৃষক বড় খোকন বলেন, তার পটল, বেগুন ও কলাই ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। জগদীশপুর গ্রামে কৃষক রোকনুজ্জামান জানান, ১০ বিঘা জমিতে আম ও ১০ বিঘা জমিতে ছিল পেয়ারা। ঝড়ে সব মাটিতে মিশে গেছে। ঝড়ের তান্ডবে উপজেলার প্রতিটি সড়ক এমনকি গ্রামাঞ্চলের পায়ে হাঁটা পথও বন্ধ হয়ে গেছে গাছ পড়ে। একের পর এক বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙ্গে পড়েছে। কবে নাগাদ মানুষ বিদ্যুৎ পাবে তা বলা কঠিন। তবে পৌর এলাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুতের সংযোগ প্রদানে কাজ চলছে বলে জানান উপজেলা পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারলে ম্যানজার।
উপজেলা কৃষি অফিসার রইচ উদ্দিন জানান, ঘূর্ণিঝড়ে চৌগাছায় কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে উঠতি ফসলের ক্ষতির পরিমান বেশি। তবে কী পরিমান ক্ষতি হয়েছে তা এখনই বলা মুশকিল। ফিল্ড অফিসাররা কাজ করছেন, খুব দ্রুত সময়ে ক্ষতির পরিমান জানা যাবে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ড. এম মোস্তানিছুর রহমান জানান, বুধবারের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে চৌগাছার সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। রাতভর ঝড় তার তান্ডব চালিয়েছে। এতে মা মেয়ের মৃত্যুসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা চেয়ারম্যান ড. এম মোস্তানিছুর রহমান, পৌর মেয়র নূর উদ্দিন আল মামুন হিমেল, থানা পুলিশের ওসি রিফাত খান রজিবসহ প্রশাসনের লোকজন এলাকা পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্থদের খোঁজখবর নেন। পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শাহিন জানান, ঘূর্ণিঝড়ে তার ওয়ার্ডের হুদা চৌগাছা মহল্লার একটি ঘরের ওপর গাছ পড়ে। এতে গাছ চাপায় মারা যান চায়না ওরফে খ্যান্ত বেগম (৪৮) ও তার মেয়ে অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী রাজেয়া খাতুন। আহত হয়েছেন চায়না বেগমের ছেলে আল আমিন (২২)। বৃহস্পতিবার বাদ জোহর নিহত মা ও মেয়ের নামাজে জানাজায় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।





