আম্পানে প্রলয় যশোরে ছয় জনের প্রাণহানি

আকরামুজ্জামান॥ ঝড়ের এমন প্রলয় আগে দেখেননি যশোরের মানুষ। আট ঘণ্টাব্যাপী বয়ে যাওয়া ঝড়ের কারণে কার্যত লন্ডভন্ড হয়ে যায় গোটা যশোর। প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের কবলে পড়ে জেলায় ৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ৫০ জন। হতাহতের পাশাপাশি মানুষের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, গাছপালা সব ধ্বংস করে দেয় আম্পান। মাছ-সবজি, আম, লিচু, পানের বরজসহ কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৈদ্যুতিক তারের ওপর গাছ আছড়ে পড়ে পুরো জেলা বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে ভেঙে পড়ে মোবাইল ফোন ও অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থা।
বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট থেকে শুরু হয় আম্পানের প্রভাবে ঝড় ও বৃষ্টি। রাত ১০টা থেকে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। যশোর বিমান বন্দর নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া অফিস থেকে জানা যায়, ১০টায় ঝড়ের গতিবেগ ছিল প্রতি ঘণ্টায় ১০৪ কিলোমিটার, রাত ১২টায় তীব্রতা বেড়ে হয় ১৩৫ কিলোমিটার। রাত পৌনে ২ টায় ঝড়ের গতিবেগ কিছুটা স্থিমিত হয়। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেও ঝড়ো হাওয়ার সাথে চলে মৃদু বৃষ্টি। ঝড়ের এ তীব্রতায় গোটা জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভূক্তভোগীরা বলেন, সিডর, বুলবুলসহ বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্কারী যে কয়টি ঝড় হয়েছে তার প্রভাবও যশোরে এমনটা পড়েনি। যেমনটা আম্পান দেখিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে ছয় জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গতকাল বিকালে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে যশোরে ছয় জন গাছ চাপায় মারা গেছেন। এরমধ্যে শার্শা উপজেলায় তিন জন, চৌগাছা উপজেলায় দুই জন এবং বাঘারপাড়ায় একজন রয়েছেন। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। নিহতরা হলেন, শার্শা উপজেলার গোগা গ্রামের পশ্চিমপাড়ার শাহজাহান আলীর স্ত্রী ময়না খাতুন (৪০), জামতলা এলাকার আব্দুল গফুরের ছেলে মুক্তার আলী (৬৫) ও শার্শা সদরের মালোপাড়া এলাকার সুশীল বিশ্বাসের ছেলে গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস (৫৫), চৌগাছা উপজেলার চানপুর গ্রামের মৃত ওয়াজেদ হোসেনের স্ত্রী খ্যান্ত বেগম (৪৫) ও তার মেয়ে রাবেয়া (১৩) এবং বাঘারপাড়া উপজেলার বুদোপুর গ্রামের সাত্তার মোলার স্ত্রী ডলি বেগম (৪৮)। ঝড়ে হতাহতের পাশাপাশি ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি করেছে। জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মাত্র কয়েকদিন আগেই জেলার বোরো আবাদ ঘরে তুলেছেন কৃষক। যেকারণে ঝড়ে বোরো ধানের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। তবে সবজি, পাট, পান, আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হেেয়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. আকতারুজ্জামান বলেন, দীর্ঘস্থায়ী ঝড়ের কারণে যশোরের ফসলের ক্ষতি বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগে এ অঞ্চলে ঝড় বয়ে গেলেও এতো সময় আর চলেনি। যে কারণে ক্ষতি হয়েছে বেশি। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আমরা জেলার ক্ষতির বিষয়টি চিহ্নিত করে এর পুরো তথ্য কৃষি মন্ত্রনালয় ও জেলা প্রশাসনের কাছে পৌছে দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ ফসলের মধ্যে রয়েছে ১১৭৮৩ হেক্টর পাট আবাদ, সবজি ১১৭৪৮ হেক্টর যা মোট আবাদের ৮০ শতাংশ, ৭৫০ হেক্টর পেঁপে ক্ষেত, ১৫০০ হেক্টর কলা ক্ষেত, ৬৭৫ হেক্টও মরিচ ক্ষেত, ১০৪৫ হেক্টর মুলা ক্ষেত, ৩ হাজার ৩৯৫ হেক্টর আম, ৬০০ হেক্টর লিচু ও ১০০০ হেক্টর পানের বরজ। এসব ফসলের মোট আবাদের ৭০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে তিনি জানান।
এছাড়া জেলার নি¤œাঞ্চল কেশবপুর-মনিরামপুরের ভবদহ এলাকায় পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির ফসল। ভেসে গেছে ঘেরের মাছ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, ঝড়ের সাথে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে যশোরের কেশবপুর, মনিরামপুরের নি¤œাঞ্চলের কিছু ঘের ও পুকুর ভেসে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে অন্যান্য এলাকায় মাছের তেমন ক্ষতি হয়নি। ঝড়ের কারণে গাছপালা ভেঙে জেলার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ন সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যশোর বেনাপোল সড়কের শতবর্ষী প্রাচীণ গাছগুলো ভেঙ্গে রাস্তার ওপর পড়ায় দুপুর পর্যন্ত ওই সড়কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো। এছাড়া যশোর-খুলনা মহাসড়, যশোর মাগুও সড়ক, ঝিনাইদহ সড়কসহ অধিকাংশ সড়কের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ফায়ার ডিফেন্সের কর্মীরা এসব গাছ সরিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করেন। এছাড়া ঝড়ে বিদ্যুতের ব্যাপক ক্ষতি করে। বিদ্যুতের তারের ওপর গাছ ও ডাল ভেঙে পড়ায় গোটা জেলায় বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১০ ঘন্টা বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন থাকার পর কিছু কিছু এলাকায় সংযোগ দেয়া হলেও এখনও দুই তৃতীয়াংশ এলাকা বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে বিদ্যুত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ জানান, সমগ্র জেলার ক্ষতি এখনও নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি। কাজ চলছে। তবে ঘর বাড়ি গাছ ভেঙে মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ঝড়ের কারণে যেসব মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ করা হচ্ছে। তালিকা প্রস্তুত শেষে এসব মানুষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হবে।

ভাগ