আকরামুজ্জামান ॥ যশোর শহরের এইচএমএম রোড, কাপুড়িয়াপট্টি রোড, হাটখোলা রোডের বাবু বাজার ও কালেক্টরেট মার্কেটসহ মূল দোকানের ভেতরে কোথাও যেনো পা ফেলার জায়গা ছিলো না। সব স্থানেই মানুষ আর মানুষ। ঈদের বাজার উপলক্ষে যেনো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। করোনা পরিস্থিতির কারণে আজ মঙ্গলবার থেকে যশোরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফের বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সোমবার শেষ বাজারে সকাল থেকেই মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। দুপুরের দিকে এসব এলাকায় প্রবেশ করা দায় হয়ে পড়ে। বাজার-মার্কেটসহ আশপাশের এলাকা ক্রেতাদের ভিড়ে লোকেলোকারণ্য হয়ে পড়ে। সবার একটাই উদ্দেশ্যে যতদ্রুত বাজার করে বাড়ি ফিরে যাওয়া। তবে এক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বা স্বাস্থ্য সুরক্ষার কোনো কিছুই মানেননি বাজারে আসা এসব ক্রেতারা। করোনা পরিস্থিতির কারণে টানা দুই মাস লকডাউনের পর গত ১০ মে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে সরকারি আদেশে সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হয় যশোরের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু জনসাধারণকে বার বার সতর্ক করার পরও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে মার্কেট-শপিংমলে ভিড় জমানোর কারণে ‘করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটি রবিবার এক সভায় মঙ্গলবার থেকে ফের দোকান পাট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। তবে ঈদের আগ পর্যন্ত যশোরের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কথা বললেও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে প্রশাসন মার্কেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে মঙ্গলবার থেকে মার্কেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এ খবরের পর সোমবার শেষ মুহূর্তে ঈদের বাজারে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েন। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষ বাজারে ভিড় জমান। প্রখর খরতাপ উপেক্ষা করে তারা এইচএমএম রোড, কাপুড়িয়াপট্রি রোড, মুজিব সড়ক, কালেক্ট্র্ররেট মার্কেটসহ বিভিন্ন শপিং মলে গিয়ে কেনাকাটা করে। তবে কেনাকাটার সময় এসব মানুষ ন্যুনতম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেনি। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও তারা যে যার ইচ্ছামতো বেচাকেনা করেন। দুপুরের দিকে যশোরের বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায় মানুষ আর মানুষ। সাধারণত ঈদের আগ রাত অর্থাৎ চাঁদ রাতে মানুষ যেভাবে বাজারে ছুঁটে আসে ঠিক তেমনি মানুষের ঢল নামে বাজারগুলোতে। তাদের একটাই উদ্দেশ্যে কেনাকাটা করা। বাজারে কথা হয় কয়েকজন ক্রেতার সাথে তারা বলেন, কাল থেকে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাবে তাই আজ যেকোনো মূল্যে বাজার করে ফিরে যেতে চাই। শাহেলা আফরিন নামে এক গৃহবধূ এসেছেন যশোর রুপদিয়া এলাকা থেকে। তিনি বলেন, কাল থেকে লকডাউন হয়ে যাবে শুনে আজ বাজারে এসেছি। কিন্তু কোনো দোকানে প্রবেশ করতে পারছিনা মানুষের ভিড়ের কারণে। করোনা পরিস্থিতিতে এমন ঝুঁকি নিচ্ছেন কেনো জানতে চাইলে তিনি বলেন, বোঝেনতো ঈদ। বছরের একটা দিনে যদি ছেলে মেয়ের জন্য বাজার করতে না পারি তাহলে কী হয়। একই কথা আফজাল হোসেন নামে আরেক ক্রেতা। তিনি বলেন, বাজারে এমন মানুষ হবে তা কখনও বুঝতে পারেনি। আমি ঝিকরগাছা থেকে এসেছি। খুব কষ্টে জুতার দোকান থেকে তিন জোড়া স্যান্ডেল কিনেছি। এখন ছেলেদের জন্য পোশাক কেনার জন্য কালেক্টরেট মার্কেটে যাবো। তিনি বলেন, দড়াটানা মোড় থেকে কাপুড়িয়াপট্টি পর্যন্ত আসতে আমার সময় লেগেছে আধা ঘন্টারও বেশি। মানুষের ভিড় সামলিয়ে চলা খুব কঠিন হচ্ছে। এদিকে বাজারে ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় হলেও ব্যবসায়ীরা মোটেও খুশি ছিলেন না। তাদের অভিযোগ শেষ বাজারে এসে যারা ভিড় জমিয়েছেন এদের অধিকাংশই গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ। ঈদের বাজারের প্রধান আকর্ষণ যারা সেই মধ্যবিত্তরা করোনার ভয়ে এবার আসছে না। তাই বেচাকেনাও কম হয়েছে।
যশোর ছিটকাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবু হোসেন বলেন, এবার ঈদে আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, মার্কেট বন্ধ ছিলো ভালোই ছিলো। কিন্তু মাঝপথে এসে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা চরম লোকসানে পড়েছি। এখন কর্মচারীদের বেতন আর ঘর ভাড়া দেবো কী দিয়ে ভেবে পাচ্ছি না। তিনি বলেন, ঈদের বাজারে যারা মূলত ক্রেতা তারা এবার আসেননি। একই কথা বলেন, শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তন্ময় সাহা। তিনি বলেন, লকডাউন চলছিলো ভালোই ছিলাম। কিন্তু দোকান খোলার অনুমতি দিয়ে আবার প্রত্যাহার করে নেওয়াতে ব্যবসায়ীদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো। না পারলাম কোনো কিছু বিক্রি করতে, না পারলাম স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে। তিনি বলেন, সামনের দিনগুলো কীভাবে যাবে সেই চিন্তায় আছি। এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ শফিউল আরিফ বলেন, মঙ্গলবার থেকে যথারীতি আগের মত যশোরের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। শুধুমাত্র ওষুুধের দোকান, নিত্যপ্রয়োজনীয়, কৃষিপণ্যর দোকান সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। তিনি বলেন, আমরা করোনা পরিস্থিতির মধ্যে মানবিক বিবেচনায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলার কারণে ফের বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছি। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে আমরা সব সময়ই কঠোর অবস্থানে রয়েছি। উল্লেখ্য গত ২৭ এপ্রিল যশোর জেলাকে লকডাউন করা হয়েছিল। পরে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১০ মে নির্ধারিত সময়ে যশোরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।





