দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভিড় সাবধানতা নেই জনতার

0

শেখ আব্দুল্লাহ হুসাইন ॥ যশোরে শপিং মার্কেটগুলোতে উৎসুক মানুষের ঢল। কেনাকাটার থেকে জামা-কাপড় দেখার লোকজনই বেশি। দোকানিরা জীবানুনাশক স্প্রে ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে ক্রেতাদের সেবা দিতে এগিয়ে আসলেও জনতা তা মোটেও গ্রহণ করছে না। ফলে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের নির্দেশনামত সামাজিক দূরত মেনে চলা এখানে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বাজারে নি¤œ ও নি¤œ মধ্যবিত্তদের ভিড়ই সবথেকে বেশি। এদের মধ্যে সচেতনতার অভাব দেখা গেছে। আর সচেতন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের করোনা সংক্রমণের ভয়ে শপিং মার্কেটগুলোতে আসতে দেখা যাচ্ছে না।
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, যশোরে শপিং মার্কেটগুলোতে ছিট কাপড় আর জুতা-স্যান্ডেল ছাড়া শাড়ি-কাপড়, বাচ্চাদের পোশাক, পানজাবি, পর্দার কাপড় ও গার্মেন্টসের দোকানগুলোতে বেচাকেনা মোটেই সন্তোষজনক নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোনো কোনো দোকানে বেলা ১২ টা পর্যন্তও পণ্য বিক্রি হয়নি। বড় বড় দোকানের মালিকদের এখন একটাই লক্ষ্য কোনোমতে কর্মচারীদের যাতে বেতনটা দিতে পারেন। তাছাড়া ঈদের আগে শেষ সপ্তাহে বেচাকেনার ভরসার ওপর আস্থা রেখে দিন গুনছেন দোকানিরা। গত ১০ মে থেকে সরকার সারা দেশে শপিং মল ও দোকানপাট খোলার অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ ১৫ রোজার পরে সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত দোকানিরা সীমিত সময়ের জন্য বেচাকেনার সুয়োগ পান। দোকানিরা বলছেন ঈদের কেনাবেচা মূলত শবেবরাতের পর থেকে শুরু হয়ে যায়। কিন্তু গত ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে শপিং মল ও দোকানপাট একটানা বন্ধ থাকায় সে সুযোগ এবার পাওয়া যায়নি। দোকান খোলার মাসখানেক আগে গত ৮ এপ্রিল শবেবরাত গেছে, এর মধ্যে গত ২৭ এপ্রিল থেকে যশোর জেলায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়। মোট কথা এবারের ঈদের বাজার আর দোকানিদের ধরা সম্ভব হলো না।
শুক্রবার যশোর শহরের কাপুড়িয়াপট্টির অত্যন্ত সুপরিচিত ‘আটপৌরে’ শাড়ির দোকানে ঢুকতে অন্তত ৪টা জীবানুনাশক স্তর পার হতে হলো। দোকানের স্বত্বাধিকারী অচিন্ত্য কুমার ধর এ প্রতিবেদককে জানান, বেচাকেনা মোটেই ভালো না। সার দিন দু একটা শাড়ি বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, গত দু মাস পুঁজি ভেঙে দোকানের কর্মচারীদের বেতন দিয়ে এসেছেন। এখন সামনের দিনগুলোতে কীভাবে চলবেন সেই দুশ্চিন্তা পেয়ে বসেছে তাঁকে। তিনি আরও জানান, গত ২৬ মার্চ দেশব্যাপী দোকানপাট বন্ধ ঘোষণার আগেই ঈদের বাজার ধরার জন্য শতকারা ৬০ ভাগ দেশি শাড়ি তিনি খরিদ করে রেখেছিলেন। তাছাড়া ভারতীয় আমদানি করা শাড়িও অন্তত শতকরা ৩৫ ভাগ কেনা হয়ে গেছে। রোজার শেষের দিকের বাজার ধরতে আরও নতুন নতুন মালামাল ভারত থেকে আনার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সে দেশের লকডাউনের জন্য আনা সম্ভব হয়নি। কাপুড়িয়াপট্টি রোডের অভিজাত শাড়ির দোকান ঐতিহ্যবাহী ‘মনসা বস্ত্রালয়’ এর স্বত্বাধিকারী চিন্ময় সাহা শুক্রবার এ প্রতিবেদককে বলেন, গত ১০ মে থেকে দোকান খোলার পর তাঁর দোকানে কোনো উচ্চশ্রেণির ক্রেতা প্রবেশ করেনি। তাছাড়া ঈদে শখ করে শাড়ি পরেন এমন ক্রেতাও এখনও আসেনি। ঘরে বয়স্ক মা- চাচিদের দেওয়ার কিছু শাড়ি কিনতে আসছেন লোকজন। তিনি আরও জানান, দোকান বন্ধ ঘোষণার আগে ঈদের বাজারের জন্য দেশি শাড়ি শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ তার কেনা আছে। লকডাউনের কারণে ভারতীয় শাড়ি আমদানি করা সম্ভব হয়নি। তিনি আশায় আছেন ঈদের আগে শেষ সপ্তাহের বেচাকেনার দিকে।
কাপুড়িয়াপট্টির পর্দার দোকান ‘নিউ ঢাকা বস্ত্র বিতান’ এর স্বত্বাধিকারী শামীম আহমেদ বিপ্লব শুক্রবার এ প্রতিবেদককে বলেন, শুধু শুধু দোকান খুলে তিনি বসে আছেন। বেচাকেনা নেই বললে চলে। অযথা বিদ্যু খরচ হচ্ছে, বিল গুনতে হচ্ছে। তিনি তার দোকানের কর্মচারীদের গত দু মাস বেতন দিতে পারেননি বলে জানান। কাপুড়িয়াপট্টি রোডে প্রসিদ্ধ গার্মেন্টসের দোকান ‘হাসান হোশিয়ারি’ এর স্বত্বাধিকারী খায়রুল বাশার শুক্রবার এ প্রতিবেদককে বলেন, মানুষের ভেতর করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভীতি কাজ করছে। সচেতন উচ্চ মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বাজারে আসছেন না। বর্তমানে যা বিক্রি হচ্ছে তা আশানুরুপ নয়। তবে তিনি এও জানান, কষ্ট করে হলেও তার দোকানের কর্মচারীদের গত দু মাসের বেতন পরিশোধ করেছেন। এইচএমএম রোডের বাচ্চাদের তৈরি পোশাকের দোকান ‘টম অ্যান্ড জেরি’ দোকানের স্বত্বাধিকারী মোল্লা আলিজা শুক্রবার এ প্রতিবেদককে জানান, বেচাকেনা মোটেই ভালো না। শুধুমাত নি¤œ ও নি¤œ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতারাই এসে দোকানে ভিড় করছে। তাদের অধিকাংশই পোশাক না কিনে নেড়েচেড়ে চলে যাচ্ছেন। এইচএমএম রোডের ছিটকাপড়ের দোকান ‘এইচএম কথ স্টোর’ এর স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ আবু হোসেন শুক্রবার এ প্রতিবেদককে জানান, ১৫ রোজার পরে দর্জির দোকানগুলো খুলেছে। এ সময় দর্জির দোকানগুলোও বন্ধ ছিল। এ কারণে ছিটকাপড় তেমন বেচাকেনা হয়নি। তিনি আরও জানান, মূলত ঈদের বাজার শবেবরাতের পর থেকে শুরু হয়ে যায়্ কিন্তু দোকানপাট বন্ধ থাকায় কোনো বেচাকেনা হয়নি। তিনি তার দোকানের কর্মচারীদের দু মাসের বেতন পরিশোধ করেছেন। এইচএমএম রোডের জুতার দোকান ‘লিবার্টি সু হাউজ’ এর স্বত্বাধিকারী পিকে মজুমদার শুক্রবার এ প্রবিদককে জানান, তার দোকানে বিক্রি মোটমুটি ভালো। এবার বিদেশি মাল আনা সম্ভব হয়নি। দেশি মাল যা ছিল তাই বেচাকেনা হচ্ছে।
কালেক্টরেট মসজিদ কমপ্লেক্স মার্কেটে প্রচুর লোকসমাগম দেখা গেল। এখানে বেচাকেনাও মোটামুটি অন্যান্য মার্কেট থেকে ভালো। বিশেষ করে নি¤œ ও নি¤œ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেল। এখানকার ‘জনপ্রিয় গার্মেন্টস’ এর স্বত্বাধিকারী অরুণ কুমার সাহা শুক্রবার এ প্রতিবেদককে বলেন, তারা বেচাকেনায় সন্তুষ্ট। তবে এবার বিদেশি পোশাক আনা সম্ভব হয়নি, সবই দেশি পোশাক তার দোকানে বিক্রি হচ্ছে। মুজিব সড়কের তৈরি পোশাকের দোকান ‘ইজি ফ্যাশন’ এর ম্যানেজার তায়েব খান শুক্রবার এ প্রতিবেদককে জানান, টুকটাক বেচাকেনা হচ্ছে। সব শ্রেণির খরিদ্দার মোটামুটি তাদের দোকানে আসছ্ েকিন্ত বেচাকেনা সন্তোষজনক হচ্ছে না। শহরের অন্যতম তৈরি পোশাকের দোকান মুজিব সড়কের ‘রঙ ফ্যাশন’ এর স্বত্বাধিকারী তনুজা রহমান মায়া শুক্রবার এ প্রতিবেদককে জানান,তার দোকানে সব শ্রেণির ক্রেতাই আসছে। কিন্ত বেচাকেনা মোট্ওে ভালো হচ্ছে না। সাধারণত ঈদের ১০ দিন আগে থেকে বেচাকেনা ভালো হয়ে থাকে, কিন্তু এবার তা হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, আমরা লাভ চায় না, পুঁজিটা যেন ঘরে উঠে আসে। এইচএমএম রোডের ‘সায়মন টেইলার্স’ এর স্বত্বাধিকারী আলতাফ হোসেন শুক্রবার এ প্রতিবেদককে জানান, সচেতন লোকজন করোনা সংক্রমণের ভয়তে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। তাদের কাছে নি¤œ মানের ছিটকাপড় নিয়ে মানুষ আসছে। উন্নতমানের ছিটকাপড় নিয়ে থ্রি-পিস বানাতে কোনো লোকজন এখনও আসেনি।