করোনা ‘যোদ্ধা’দের সুরক্ষার জন্য ফেসশিল্ড তৈরি করছে মোংলা ছাত্র সমাজ

মনিরুল হায়দার ইকবাল, মোংলা (বাগেরহাট)॥ মরণঘাতী করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সম্মুখযুদ্ধে কাজ করে যাওয়া চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মি, সাংবাদিক ও পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের সুরায় মোংলায় তৈরী করা হচ্ছে ফেসশিল্ড। করোনা মোকাবেলায় ফেসশিল্ড অত্যন্ত কার্যকরী একটা উপকরণ। ইতিমধ্যে মোংলায় তৈরী করা প্রায় দুই হাজার ফেসশিল্ড স্থানীয় চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মী, সাংবাদিক ও পুলিশের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ছাত্র সুমিত চন্দ লক ডাউনের ছুটিতে মোংলায় গ্রামের বাড়ি চলে আসেন। বাড়িতে আসার পর চিন্তা করতে লাগলেন মরণঘাতী করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় কিছু একটা করার। আর তার সেই চিন্তার তাগিদ দিয়েই সিদ্ধান্ত নেন করোনা যোদ্ধা বিশেষ করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মিদের নিরাপত্তার জন্য ফেসশিল্ড তৈলী করার কথা। মোংলার সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিবেশ কর্মি শেখ মোঃ নুর আলমের সহায়তা আর দু’জন ব্যক্তির আর্থিক সহায়তায় সুমিত বাসায় বসেই করোনায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে গবেষণা করতে করতে প্রথম পর্যায়ে ১০০ ফেসশিল্ড তৈরি করে ফেলেন। প্রথম দফার তৈরী এ ১০০ ফেসশিল্ড বিতরণ করা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্স ও খুলনা মেডিক্যাল কলেজ করোনা ইউনিটসহ স্থানীয় সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। এরপর ডাক্তারদের ইতিবাচক সাড়া পেয়ে এই উদ্যোগে উদ্দীপ্ত হয়ে পরবর্তীতে সুমিতের সাথে এগিয়ে আসেন বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র অর্নব খান এবং গোপালগঞ্জ শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যালের ছাত্র শুভ রায়। তাদের নেতৃত্বে এগিয়ে আসে রিফাত (রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়), ইরফান(রুয়েট), শান্ত (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়), সুদীপ্ত (ফরিদপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ),শান্তনু ( খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়) এবং রাইয়ান (শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজ)।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ করোনা ইউনিটে ফেসশিল্ড বিতরণের খবর পেয়ে খুলনাসহ আশেপাশের প্রায় সব হাসপাতাল থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে থাকে। খুলনা প্রকৌশল ও পযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এলামনাই এবং মোংলার কয়েকজন বিত্তবানের আর্থিক সহযোগিতায় তারা ‘মোংলা ছাত্র সমাজ’ এর ব্যানারে নেমে পড়েন খুলনার ডাক্তারদের সুরা দেওয়ার মিশনে। অনেক কষ্ট করে এই লকডাউনের মধ্যেই মোংলা থেকে খুলনা যাওয়া আসা করে এবং পরবর্তীতে যশোর থেকে ফেসশিল্ড তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করেন সুমিত। এরপর শুরু হয় দিনরাত ফেসশিল্ড তৈরির কাজ। ইতিমধ্যে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ শেখ আবু নাসের হাসপাতাল, আদ-দ্বীন আকিজ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল , খুলনা সদর হাসপাতাল, খুলনা শিশু হাসপাতাল, ফুলতলা স্বাস্থ্য কমপেক্স, রামপাল স্বাস্থ্য কমপেক্স, বটিয়াঘাটা স্বাস্থ্য কমপেক্স, চালনা স্বাস্থ্য কমপেক্সে পৌঁছে দেন প্রায় ২ হাজার ফেসশিল্ড। ফেসশিল্ডগুলো পেয়ে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক ডা. বিধান চন্দ্র গোস্বামী বলেন, ‘আমার দেখা ফেসশিল্ডগুলোর মধ্যে এটি অনেক ভালো হয়েছে। এভাবেই কুয়েটসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা ডাক্তারদের পাশে এগিয়ে এলে আমরা আরো ভালো মোকাবিলা করতে পারবো’।
এদিকে খুলনা শিশু হাসপাতালের আইএমও ডা. নূর এ আলম সিদ্দিকী তুহিন বলেন, ‘বর্তমানের এই কঠিন সময়ে শিার্থীরা নিজ উদ্যোগে আমাদের সুরার জন্য যেভাবে ফেসশিল্ডগুলো তৈরি করেছে এবং বিতরণ করছে তা সত্যিই প্রশংসনীয় এবং অনুকরণীয়। মহৎ এই কার্যক্রমের উদ্যোক্তা সুমিত বলেন, ‘গত ১১ এপ্রিল থেকে আমরা কাজ শুরু করেছি। প্রথমে যখন ১০০ পিস তৈরি করেছিলাম তখনো ভাবিনি এতটা কাজে আসতে পারবো ডাক্তারদের। প্রাথমিকভাবে চিন্তা ছিলো ডাক্তারদের নিজেদের বানিয়ে নিতে গেলে যে সময়টা খরচ হতো সেটা বাঁচানোর জন্য বানাচ্ছি। এই দুঃসময়ের সম্মুখ যোদ্ধা ডাক্তারদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করতে পারাটা অবশ্যই গর্বের। কুয়েটের সিনিয়ররা এবং মোংলার বিত্তবানেরা আমাদের পাশে দাঁড়ানোর ফলে বিনামূল্যেই এগুলো দিতে পারছি’। সুমিত আরো জানান, সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যখন ডাক্তাররা ফেসশিল্ডের জন্য যোগাযোগ করা শুরু করলো, তখন এই উদ্যোগটা সারাদেশের শিার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আমরা ফেসবুক গ্রুপ খুলে এ সম্পর্কিত সকল রিসোর্স এবং ভিডিও টিউটোরিয়াল বানিয়ে গাইডলাইন দেয়ার পাশাপাশি একইসাথে স্থানীয়ভাবে কাঁচামালগুলো খুঁজে পেতে সহায়তা করতে শুরু করি।
এই উদ্যোগে সাড়া দিয়ে ইতিমধ্যে নাটোরে ‘তেরো ফাউন্ডেশন’, যশোরে ‘পাশে আছি আমরা, নওগাঁতে ‘অদম্য নজিপুর ’, মৌলভীবাজারে ‘ইউনিভার্সিটি এসোসিয়েশন অফ আলীনগর’, কুয়েটের বিভিন্ন সংগঠন ছাড়াও নিজেদের উদ্যোগে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বরিশাল, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, চাপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রংপুর, কিশোরগঞ্জ , পঞ্চগড়,নওগাঁ, বাগেরহাট, খুলনা জেলায় সর্বমোট ২৩ টি টিম ফেসশিল্ড তৈরি এবং বিতরণ করছে। করোনা প্রাদুর্ভাবে ছাত্ররা যেমন হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়ে বিতরণ করেছিলো, তেমনি এখন ফেসশিল্ডের সময়েও ছাত্ররা এগিয়ে এসেছে। এ উদ্যোগের প্রথম সহায়তাকারী মোংলার সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিবেশ কর্মি শেখ মোঃ নুর আলম জানান, করোনরা যোদ্ধাদের মধ্যে চিকিৎসক ছাড়াও স্বাস্থ্য কর্মি, সাংবাদিক ও পুলিশসহ অন্যান্য পেশার লোক নিয়োজিত রয়েছেন। চিকিৎকদের পাশাপাশি স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মি, সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও করোনা মোকাবেলায় সুরক্ষা হিসেবে প্রায় মাস ব্যাপী সময়ে বিনামূল্যে এ ফেসশিল্ড বিতরণ করতে পেরে আমরা খুশী। তিনি আরো বলেন, সমাজের বৃত্তবানরা এগিয়ে আসলে আরো বেশী ফেসশিল্ড তৈরী করে সংশ্লিষ্টদের মাঝে বিতরণ করা সম্ভব।

ভাগ