যশোর না খুলনা ল্যাবের রেজাল্ট অস্বাভাবিক?

কবীর সাঁই॥ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় জেনোম সেন্টার ও খুলনা মেডিকেল কলেজ ল্যাবের নমুনা পর্াীর ফলাফলে বিস্তর ফারাক নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের নমুনা পরীার এই ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যশোরে পরীা করা নমুনার প্রায় ১৫ শতাংশ পজেটিভ ফল দিয়েছে। পান্তরে খুলনায় পরীা করা নমুনাগুলোর পজেটিভ হওয়া রেজাল্ট এক শতাংশেরও কম। পাশাপাশি দুই জেলার ল্যাবের ফলাফলের এই আকাশ-পাতাল ফারাক যে বাস্তবসম্মত নয়, তা স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাহলে কোন ল্যাবের ফলাফল গ্রহণযোগ্য, আর কোনটি নয়? প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে কোন ল্যাবে কারা কাজ করছেন? তাদের দতার মাত্রাই বা কেমন?
খুলনা মেডিকেল কলেজের উপাধ্য মেহেদী নেওয়াজ সেখানকার সংবাদকর্মীদের জানিয়েছেন, শনিবার পর্যন্ত খুলনা ল্যাবে মোট তিন হাজার ৫৬টি নমুনা পরীা হয়েছে। আর রোববার পরীা হয় ১৭২টি। সব মিলিয়ে তিন হাজার ২২৮টি নমুনা পরীা করে ল্যাবটি ১৬০টিকে পজেটিভ হিসেবে শনাক্ত করেছে। অর্থাৎ পরীতি নমুনাগুলোর মাত্র শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ পজেটিভ। অন্যদিকে, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারে এযাবৎ (রোববার পর্যন্ত) এক হাজার ১৬টি নমুনা পরীা হয়েছে। এর মধ্যে পজেটিভ ফল এসেছে ১৬০টির। অর্থাৎ পরীতি নমুনার ১৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ পজেটিভ। যেসব ব্যক্তির শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হয়, তারা সবাই করোনা রোগী হিসেবে সন্দেহভাজন। এই সন্দেহভাজনদের এক শতাংশেরও কম যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত থাকেন, তাহলে স্বাস্থ্য বিভাগের দতা-যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই সঙ্গত। যশোর স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাদের অভিযোগ, যবিপ্রবির জেনোম সেন্টার থেকে অনেক বেশি বেশি পজেটিভ রেজাল্ট আসছে। পান্তরে খুমেক ল্যাবে পজেটিভ খুবই কম। দৃশ্যত এই কারণে যশোর থেকে খুলনা ল্যাবে নমুনা পাঠানোর হার বাড়িয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
কিন্তু দেশের সামগ্রিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, যবিপ্রবিতে পজেটিভ ফলাফল আসার হার অস্বাভাবিক নয়। বরং খুমেক ল্যাবের ফলাফলই নিশ্চিতভাবে অস্বাভাবিক। বিষয়টি বিস্তারিত জানার চেষ্টায় ঢুঁ মারা হয় খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের ওয়েবসাইটে। খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখাশুনা করে এই দপ্তর। কিন্তু তাদের ওয়েবসাইটে কোডিভ-১৯ সংক্রান্ত বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই। আরো আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, রোববার রাতে ফমযং.শযঁষহধফরা.নফ ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখা যায়, এটি সবশেষ আপডেট হয়েছে গেল মাসের ৬ তারিখে। করোনাকালে স্বাস্থ্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ একটি ওয়েবসাইটের এই হাল রীতিমতো হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন খুলনায় কর্মরত সংবাদকর্মীরা। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারে কারা, কোন পদ্ধতিতে কাজ করছেন, তা মিডিয়াকর্মীরা মোটামুটি অবগত। এই সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবও একাধিকবার দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল পদাধিকারীরা। কিন্তু খুলনার চিত্র উল্টো।
খুলনার সংবাদকর্মীরা বলছেন, সেখানকার একজন কর্মী সম্প্রতি মিডিয়ার সামনে মুখ খুলে তোপের মুখে পড়েন। ফলে পরীা কার্যক্রম সম্বন্ধে খুব কমই জানতে পারছেন মিডিয়াকর্মীরা। অথচ তাদের মনে প্রশ্ন রয়েছে, খুলনা ল্যাবে কেন এই অস্বাভাবিক রেজাল্ট আসছে? খুলনার একাধিক সংবাদকর্মী নিশ্চিত করেছেন, খুমেক ল্যাবে মোট পাঁচজন টেকনিশিয়ানের পোস্টিং আছে। অথচ কাজ চালানো হচ্ছে এক বা দুইজনকে দিয়ে। মূল কাজটি যে টেকনিশিয়ান করছেন, তাকে যোগাড় করা হয়েছে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে। অবশ্য এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিপরীতে যবিপ্রবি ল্যাবে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের একজন প্রফেসরের নেতৃত্বে সাত সদস্যের টিম নমুনা পরীার কাজে নিযুক্ত। এর মধ্যে পাঁচজন সরাসরি পরীার কাজ করেন। দুইজন থাকেন লজিস্টিক সাপোর্টে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন।
যবিপ্রবি উপাচার্য নিজে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অণুজীববিজ্ঞানী। জেনোম সেন্টারটি পরিচালিতও হয় তারই তত্ত্বাবধানে। প্রফেসর ড. আনোয়ার বলেছেন, কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করতে পিসিআর মেশিনে যে নমুনা পরীার কাজ হয়, তা কখনো টেকনিশিয়ানদের দিয়ে হওয়ার নয়। এই কাজে আরো উচ্চশিতি দ জনবল দরকার হয়। এই বিষয়গুলো বুঝেও যশোর স্বাস্থ্য বিভাগ কী কারণে খুলনা ল্যাবে নমুনা পরীার ব্যাপারে এতো আগ্রহী তা এক ঘোর রহস্য। সিভিল সার্জনকে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘আমার সামনে অপশন আছে। আমি যেকোনো ল্যাবে নমুনা পাঠাতে পারি।’ কথা প্রসঙ্গে তিনি এ-ও জানিয়েছিলেন, যশোর ল্যাবে বেশি বেশি পজেটিভ রেজাল্ট আসছে। খুলনা ল্যাবে অনেক কম পজেটিভ আসে। যশোর ল্যাবের ফলাফল নিয়ে সিভিল সার্জনের অসন্তোষ থাকলেও খুলনার ফলাফল নিয়ে তার মুখে রা নেই।
তবে কি যশোরের স্বাস্থ্য প্রশাসন এই জেলায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম দেখাতে চাইছে? এই প্রশ্নের জবাব পেতে হয়তো আরো কিছুটা অপো করতে হবে।

ভাগ