যশোরে মদপানে মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের আটকে পদক্ষেপ নেই

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ভেজাল অথবা বিষাক্ত মদপানে যশোরে মানুষের মৃত্যুর মিছিলের জন্য দায়ী কয়েকজন ছাড়া আর কোনো মাদক ব্যবসায়ী আটকে পদক্ষেপ নেয়নি পুলিশ। অথচ আটক মাদক ব্যবসায়ী হাসানের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মোতালেব ও জাকিরসহ অন্তত ৪০ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম প্রকাশ পেয়েছে। এইসব মাদক ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। আবার এদের মধ্যে দুজন ফেরি করে ভেজাল মদ বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বলে তথ্য মিলেছে। এদিকে মদপানে মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেয়ার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তা জমা পড়েনি। এ বিষয়ে জানতে চায়লে বিরক্তি প্রকাশ করেন যশোরের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. বাহাউদ্দিন।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে শহরের দুটি পতিতাপল্লীর সামনে অবৈধ মদ বিক্রির ঘটনায় সদর ফাঁড়ি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কথিত ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হতো। এ কারণে ফাঁড়ির পুলিশের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে দুটি পতিতাপল্লীর সামনে এতোদিন অবৈধ মাদক ব্যবসা হচ্ছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ভেজাল অথবা বিষাক্ত মদপানে যশোর জেলায় ১৭ জন মাদকসেবীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় মারা যান ১০ জন। এরা হচ্ছেন-শহরের ঘোপের শরিফুদ্দিন মুন্না, সাবু, রেলগেট চোরমারা দিঘিরপাড় এলাকার আজিয়ার রহমান, বারান্দী মোল্লাপাড়া বাঁশতলা এলাকার আব্দুর রশিদ, বেজপাড়ার নান্টু, শহরতলীর শেখহাটির খন্দকার শাহিন হোসেন, বালিয়াডাঙ্গা মান্দারতলার ফজলুর রহমান চুক্কি, আরবপুর গোরাপাড়ার প্রল্লাদ দাস প্রমুখ। ভেজাল মদপানে এই মৃত্যুর মিছিল শুরু হওয়ায় প্রথমে একটু নড়েচড়ে বসেছিলো পুলিশ। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে মাড়–য়া মন্দির সংলগ্ন পতিতালয়ের অবৈধ মদ ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসানের দোকানে অভিযান চালিয়ে এক শ মিলিলিটার রেক্টিফাইড স্পিরিট জব্দ করে। পরে হাসানও আটক হয়। এছাড়া চোলাই মদসহ সাজু নামে আরও একজন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশ। অপরদিকে খন্দকার শাহিন হোসেন, ফজলুর রহমান চুক্কি এবং শরিফুদ্দিন মুন্না ভেজাল মদপানে মৃত্যুর ঘটনায় তাদের পরিবার কোতয়ালি থানায় আলাদা মামলাও করে। এদিকে মদ ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান আদালতে ১৬৪ ধারায় যে জবানবন্দি দেয় তাতে অবৈধ মদ ব্যবসার সাথে জড়িত অন্তত ৪০ জনের নাম প্রকাশ পেয়েছে। এরা হচ্ছে-মাড়–য়ারি মন্দির সংলগ্ন পতিতাপল্লী এলাকায় হাসান, আমির হোসেন বাবু, পিন্টু, রতন, চান, সাজু, সুলতান, মিন্টু, শহিদ, কালিদাস, খোকন, কৃষ্ণ, বাবু বাজার পতিতালয় এলাকায় মোতালেব, জাকির, রশিদ, পাপ্পু, মন্টু সাহা, রাসেল, শফি, মহাসিন, এমকে রোডের পাশে সুইপার কলোনিতে কালু, মতি, দেবলীয়া, রাজু, জুয়েল, অশোক, বাদল, সুজন, সার্জেন্ট, পান্না, মান্না ও রামলাল। পাশাপাশি দেশি মদের সংকটের কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ রেক্টিফাইড স্পিরিট দিয়ে ভেজাল মদ তৈরির সাথে জড়িতদের নাম প্রকাশ করে হাসান।এরা হচ্ছে-সোনালী ব্যাংকের সামনের মদের দোকানের কর্মচারী নজির, তার দুই ছেলে নিশি ও আব্দুল, মদ ব্যবসার বৈধ লাইসেন্সের মালিক ইয়াকুব আলীর ম্যানেজার রাজ্জাক, গহর, লাভলু, বাবলু, শংকর, বাবু বাজার পতিতাপল্লীর সামনের জাকির, মাড়–য়া মন্দির সংলগ্ন পতিতাপল্লী এলাকার সাজু ও মিন্টু। পুলিশ প্রথমে মাহমুদুল হাসান, সাজু, আমির হোসেন বাবু এবং খোকন মাস্টারকে আটক করে। পরে আরও ৫ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতয়ালি থানা পুলিশের এসআই হারুন অর রশিদ। এরা হচ্ছেন, রাজ্জাক, মিন্টু, রতন, চান এবং আব্দুল। পতিতাপল্লী এলাকা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, অবৈধ মদ ব্যবসার সাথে জড়িত অন্যদের মাঝে মধ্যে পতিতাপল্লী এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। কিন্তু সদর ফাঁড়ির পুলিশ ওই এলাকায় ডিউটি করলেও মদ ব্যবসায়ীদের আটকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। সূত্র জানায়, মূলত সদর ফাঁড়ি পুলিশের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে এতোদিন দুটি পতিতাপল্লী এলাকার অবৈধ মদ ব্যবসায়ীরা টিকেছিলো। এইসব অবৈধ মদের দোকানের আশপাশে ফাঁড়ির পুলিশকে প্রায় ডিউটি পালন করতে দেখা যেত। কিন্তু ফাঁড়ির পুলিশ কখনো অবৈধ মদ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। বরং ফাঁড়ি পুলিশের নামে কথিত ক্যাশিয়ার সেখান থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করতো। সূত্রটি আরও জানায়, দুটি পতিতাপল্লী এলাকার অবৈধ মদের দোকান বর্তমানে বন্ধ থাকলেও নিপু ও মহসিনের ব্যবসা থেমে নেই। বাবু বাজার এলাকার অবৈধ মদের কারবারি জাকিরের এই দুই কর্মচারী ভেজাল মদ তৈরি করে মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন স্থানে সাপ্লাই দিচ্ছে। এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর নামে সরকারের এই সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভেজাল মদপানে এতো মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও তাদের কার্যকর কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মাদকসেবীদের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে দুজন ইনসপেক্টরকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিলো এই সংস্থা। গত ২৭ এপ্রিল গঠিত কমিটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু যশোরের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. বাহাউদ্দিন এই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সম্পর্কে নিয়ে কোনকিছু বলতে চাচ্ছেন না। যোগাযোগ করা হলে তিনি বিরক্ত প্রকাশ করে বলেন, রিপোর্ট নিয়ে বারবার কথা বলছেন কেন।

ভাগ