১৮ বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে ভারতের জ্বালানি তেল উত্তোলন

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল খাতে ভারত মূলত আমদানিনির্ভর দেশ। তবে দেশটির নিজস্ব কূপগুলো থেকে সীমিত পরিসরে জ্বালানি তেল উত্তোলন হয়। বিশেষত রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে দেশটির উৎপাদনশীল কিছু জ্বালানি তেলের কূপ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে পণ্যটির উত্তোলন বাড়াতে জোরারোপ করেছে দেশটি। এ লক্ষ্যে দেশটি নানা ধরনের প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। পণ্যটির আমদানি বিলের পরিমাণ কমিয়ে এনেছে। তা সত্ত্বেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে (এপ্রিল-মার্চ) ভারতে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। এ সময় দেশটিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উত্তোলন কমে গত ১৮ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দেশটির সরকারি সূত্র সম্প্রতি এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। একই সময়ে দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্তোলনেও মন্দা ভাব বজায় ছিল। খবর ইকোনমিক টাইমস ও বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
ভারতের জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশটির কূপগুলো থেকে মোট ৩ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন হয়েছে, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৬ শতাংশ কম। একই সঙ্গে এটা গত ১৮ বছরের মধ্যে জ্বালানি পণ্যটির সর্বনিম্ন উত্তোলন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশটি সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৪২ লাখ ৩ হাজার টন জ্বালানি তেল উত্তোলন করেছিল। সে হিসেবে এক বছরের মধ্যে দেশটিতে পণ্যটির উত্তোলন ২০ লাখ ৩০ হাজার টন কমেছে।
এর মধ্যে শুধু মার্চেই পণ্যটির উত্তোলন আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ কমেছে। মূলত মার্চের উত্তোলন হ্রাস পুরো অর্থবছরের উত্তোলন হ্রাসের পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দেশটিতে গত মাস থেকে শুরু হয় লকডাউন। এতে দেশটির পরিবহন ও শিল্প খাতের সব ধরনের কর্মকাণ্ড কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশটির জ্বালানি তেল উত্তোলন খাতে।
মার্চে ভারতে সব মিলিয়ে ২৭ লাখ ১ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন করা হয়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতেও দেশটিতে পণ্যটির উত্তোলনে নিম্নমুখী প্রবণতা বাজায় ছিল। ফেব্রুয়ারিতে দেশটির নিজস্ব কূপগুলো থেকে সব মিলিয়ে ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন হয়েছিল, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ কম ছিল।
এদিকে উত্তোলনে ক্রমহ্রাসমান প্রবণতা ভারতের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভরতাকে এক ধাক্কায় অনেকটা ওপরে তুলে দিয়েছে। দেশটির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এখনো গত মার্চের ও পুরো অর্থবছরের জ্বালানি তেল আমদানি সম্পর্কিত পূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তবে বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (এপ্রিল-ফেব্রুয়ারি) ভারতে পণ্যটির আমদানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
উল্লেখ্য, ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালের মার্চে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতে দেশটির আমদানিনির্ভরতা ছিল ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২২ সালের মধ্যে পণ্যটির আমদানিনির্ভরতা ১০ শতাংশ কমিয়ে এনে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করে দেশটি এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপও গ্রহণ করে।
এদিকে লকডাউনের জেরে উত্তোলন হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে মার্চে দেশটিতে জ্বালানি তেলের পরিশোধ কার্যক্রমও হ্রাস পেয়েছে ব্যাপকহারে, যা পুরো অর্থবছরের পরিশোধন হ্রাসে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। কভিড-১৯-এর প্রকোপ দেশটিতে জ্বালানি তেলের চাহিদা রেকর্ড কমিয়ে এনেছে, ফলে পণ্যটির পরিশোধন কমিয়ে আনতে বাধ্য হয় পরিশোধনাগারগুলো। ২০১৯-২০ বিপণন বর্ষে ভারতের পরিশোধনাগারগুলোর সম্মিলিত জ্বালানি তেল পরিশোধন দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ৪৩ লাখ ৮০ হাজার টনে, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ১ দশমিক ১ শতাংশ কম। এর মধ্যে শুধু মার্চেই কমেছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। গত মাসে দেশটি পরিশোধন করেছে মোট ২ কোটি ১২ লাখ টন জ্বালানি তেল।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারতের সরকারি পরিশোধনাগারগুলো মোট ১৪ কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার টন জ্বালানি তেল পরিশোধন করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ কম এবং দেশটির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২ দশমিক ১৮ শতাংশ কম।
অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সঙ্গে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারতের প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনেও মন্দা ভাব বজায় থাকতে দেখা গেছে। দেশটির জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে দেশটিতে সব মিলিয়ে ৩ হাজার ১১৭ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশটিতে মোট ৩ হাজার ২৮৭ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলিত হয়েছিল। এর মধ্যে শুধু মার্চেই জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ কমেছে।