জাতীয় ঐক্যের আহ্বান ভেবে দেখুন

0

করোনাভাইরাস মহামারীতে প্রায় একমাস ধরে দেশের সব অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও উৎপাদন ব্যবস্থা স্তব্ধ হয়ে আছে। প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্ট ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের প্রধান রফতানিমুখী খাত এবং জাতীয় রাজস্ব মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে। এসব খবরের পাশাপাশি সংবাদ মাধ্যমে বলা হচ্ছে-
বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্র ও অঞ্চল করোনাভাইরাস মহামারীর শিকার। আইএমএফ বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। জীবন বাঁচাতে ঘরে বসে থাকলে সংকট আরো বাড়বে। বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতির বাইরে নয়। আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যা কিছুই ঘটুক, বাংলাদেশ তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতের প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খুব সহসা আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। একইভাবে আমাদের প্রধান বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার সউদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা আগে থেকেই সংকটাপন্ন। সেই সাথে ইউরোপ আমেরিকা থেকেও হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিক প্রতিমাসে শত শত মিলিয়ন ডলার পাঠাচ্ছে। করোনামহামারীতে সেসব দেশে কোটি কোটি মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেই সাথে বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ফেরত পাঠানোর কথাও শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখী। সংবাদ মাধ্যমে বলা হচ্ছে- বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-এর তরফ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যেসব প্রিডিকশন দেওয়া হয়েছে তা খুবই হতাশাজনক। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে করোনাভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩-২ শতাংশে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার জনসংখ্যার সাথে করোনা পরবর্তী বাস্তবতায় নতুন করে লাখ লাখ কর্মহীন মানুষ যোগ হবে। প্রায় একমাস ধরে লকডাউন করোনাভাইরাসের প্রাণঘাতী সংক্রমণের ভীতি অগ্রাহ্য করেই সারাদেশে লাখ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর কড়াকড়ি তাদেরকে ঘরে আবদ্ধ রাখতে পারছে না। করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব ও দরিদ্র মানুষের ন্যূনতম খাদ্য নিরপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি দেশে সামাজিক বিশৃঙ্খলা নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
একাধিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। শুধুমাত্র প্রবাসী কর্মীদের রেমিটেন্স এবং গার্মেন্ট রফতানি থেকে প্রাপ্ত আয়ে দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও নতুন কর্মসংস্থানের সংকট এবং এবং ব্যাংকসহ আর্থিক খাতসমূহের ভগ্নদশায় অর্থনীতিবিদরা বরাবরই সরব ছিলেন। চলমান করোনা সংকট কতদিন প্রলম্বিত হয়, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে করোনা পরবর্তী সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট মোকবেলায় এখনই সমন্বিত কার্যকর পদপে নিতে হবে। বিশেষত আগামীতে অনানুষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দিতে সম্ভাব্য সব রকম সহায়তা দিতে হবে। ইতোমধ্যে দুই দফায় প্রায় লকোটি টাকার উদ্ধার তহবিলের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সেখানে লকডাউনে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য ও অর্থসহায়তার খাত খুব সন্তোষজনক নয়। যতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাতেও প্রশাসন ও সরকারি দলের লোকদের বিশৃঙ্খলা, অস্বচ্ছতা চুরি ও লুটপাটের শিকার হওয়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি সহায়তার খাত এমন লুটপাটের ধারাবাহিক প্রবণতা থেকে বের করতে না পারলে আগামীতে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা রয়েছে। দুঃখজনক হচ্ছে এমন বৈশ্বিক ও জাতীয় দুর্যোগের সময়কে জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে মোকাবেলার উদ্যোগ নিচ্ছে না সরকারকে। অথচ, এখন জাতীয় ঐক্যই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। প্রধান বিরোধী দল বারবার সে আহ্বান জানাচ্ছে। সরকারের উচিত হবে সে আহ্বানে সাড়া দেয়া দলীয় স্বার্থ ও মতভেদ ভুলে সব রাজনৈতিক দলকে একমঞ্চে দাঁড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিশেষ প্যাকেজ থেকে বাংলাদেশের উদ্ধার তহবিলে প্রাপ্য আদায় করার পাশাপাশি জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের অর্থনীতিবিদদের মতামতের ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এই মুহূর্তে দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর বিশেষ নজর দিতে হবে। করোনাভাইরাসের লকডাউন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনের সাথে টেলিকনফারেন্স করেছেন। দেশে বিদেশে থাকা সব মতেরঅর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়েও অনুরূপ টেলিকনফারেন্স করা যেতে পারে। তাদের সবার সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক প্রণোদনার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করছেন। চরম বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আমরা আশা করবো প্রধানমন্ত্রী নিজ অবস্থান থেকে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান ও প্রয়োজনীয়তা ভেবে দেখবেন।