সাব কন্ট্রাক্ট কারখানাগুলো শ্রমিকদের বেতন না দিলে দায়িত্ব কার?

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ গার্মেন্ট শিল্পে ৪৫ লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত। কিন্তু, এর সবই গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর সদস্য নয়। উঠতি উদ্যোক্তা ও বড় কোনও কারখানার পাওয়া কাজের কিছু অংশ চুক্তির ভিত্তিতে (সাব কন্ট্রাক্ট) করে থাকে এসব কারখানা। এগুলোর সবগুলোই নিবন্ধন আছে কিনা বা থাকলেও কিভাবে হয় তা নিয়েও অনেক গার্মেন্ট মালিকের আছে সংশয়। তবে শ্রমিকদের তা জানা নেই। তারা বেতন পাওয়ার আশ্বাসে চাকরি করেন। আর বেতন আটকে গেলেই আত্মগোপনে যান এসবের মালিক, বেতনের দাবিতে পোশাক শ্রমিকের বিক্ষোভ মিছিলে সমালোচিত হয় পুরো তৈরি পোশাক খাত। শ্রমিকরা কাজ করেছেন, বেতন তাদের দিতেই হবে। কিন্তু, বিজিএমইএ ও বিকেএমই’র সদস্য না হলে পুরো দায় তাদের ওপরে বর্তায় কিনা সে প্রশ্ন তুলেছেন এসব সংগঠনের নেতারা। এ দুই সংগঠনের নেতারা বলছেন, তারা এসব মালিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যদি খুঁজেই পাওয়া না যায় তাহলে এসব শ্রমিকের বেতনের কী হবে করোনাভাইরাসের এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে এ প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
পোশাক কারখানা পালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৮৭ শতাংশের মতো শ্রমিক মার্চ মাসের বেতন পেয়েছেন। আর বিকেএমইএর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একইদিনে তার ৯০ শতাংশ শ্রমিককে মার্চ মাসের বেতন দিয়েছেন। এ দুটি সংগঠনভুক্ত বাকি কারখানাগুলোর শ্রমিকদের বেতন হয়ে যাওয়ার বিষয়েও আশ্বস্ত করেছেন দুই সংগঠনের নেতারা। তবে তাদের এই ঘোষণায় আশ্বস্ত নন শ্রমিক নেতারা। এমনকি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র দেওয়া তথ্য নিয়েও প্রশ্ন আছে তাদের। পোশাক শ্রমিকরা করোনার সময়ে রাস্তা আটকে বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে চায়। এসময় পোশাক শ্রমিকরা পুলিশের গাড়ির সামনে বসে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ৮৭ শতাংশ শ্রমিক বেতন পেলে আমাদের রাস্তায় নামতে হতো না। আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনরা মার্চ মাসের বেতন এখন পর্যন্ত পায়নি। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছু নেই। তিনি বলেন, শ্রমিকদের কাজ মালিকদের ভালো লাগে, কিন্তু মাস শেষে বেতন দিতে ভালো লাগে না। মালিকরা শ্রমিকদের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছেন না বলেই শ্রমিকরা আজ রাস্তায় নেমেছে। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে বেতন না পেয়ে মিরপুরে ফ্যালকন গার্মেন্টস; দক্ষিণখানে রেদওয়ান, সিএনবি, স্যার ডেনিম, সারা ফ্যাশন, সুপার সাইন; রূপনগরে মনির ফ্যাশন; কমলাপুরে সর্দার ও বিন্নি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বকেয়া বেতনে দাবিতে আন্দোলন করছেন। দক্ষিণখানের রেদওয়ান গার্মেন্টের শ্রমিক আল আমিন জানান, তাদের তিন মাসের বকেয়া রয়েছে। গার্মেন্টের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হচ্ছে না। তাই তারা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছেন। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর কমলাপুরে সর্দার ও বিন্নি নামে দুটি গার্মেন্টস কর্মীরা বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় অবরোধ করে বিক্ষোভ করার বিষয়টি বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হকের নজরে আনা হলে তিনি বলেন, সর্দার গার্মেন্টস বিজিএমইএর সদস্য নয়।
তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্দোলনে থাকা গার্মেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা ৮৭ ভাগ কারখানায় শ্রমিকদের বেতন দিয়ে দিয়েছি। ২৪ লাখ ৭২ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ২১ লাখ ৫৯ হাজারের বেতন ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। বাকি যেগুলো আছে সেগুলো ছোট। এসব ফ্যাক্টরিতে ১৫০-২০০ লোক কাজ করে। এই ফ্যাক্টরিগুলো অনেক সময় সরাসরি এক্সপোর্টের কাজও করে না। তারা সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করে। তবে ছোট বড় যে কোনও কারখানার শ্রমিকই যখন রাস্তায় নামে তখন সেটা আমাদের দায়িত্ব হয়ে যায়। আমরা তথ্য পাওয়া মাত্রই সমস্যা সমাধানের জন্য যোগাযোগ করছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে।’ এদিন সন্ধ্যায় বিজিএমইএ’র দেওয়া তথ্যমতে, বিজিএমইএর সদস্য দুই হাজার ২৭৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক হাজার ৬৬৫টি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করেছে। এছাড়া ঢাকার ৯৭ এবং চট্টগ্রামের ১১৯ প্রতিষ্ঠানের বেতন পরিশোধ প্রক্রিয়াধীন। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত ২১ লাখ ৫৯ হাজার ১০০ শ্রমিক মার্চ মাসের বেতন পেয়েছে যা বিজিএমইএর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের ৮৭ শতাংশ। এখনও যে তিন লাখ ১৩ হাজার ৩১৭ শ্রমিক মার্চ মাসের বেতন পাননি, তারা বিজিএমইএর সদস্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের বাকি ১৩ শতাংশ।
তবে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের হিসেবে অন্তত ৩০ শতাংশ শ্রমিক এখনও মার্চ মাসের বেতন পাননি। সংগঠনটির সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নেওয়ার জন্য মালিকরা শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়িয়ে বলে। একারণে ৮৭ শতাংশ শ্রমিক বেতন পেয়েছে বলা হচ্ছে আসলে পেয়েছে ৭০ শতাংশ। বেতন না দিয়েই বেতন দেওয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, এখনও অন্তত ৩০ শতাংশ শ্রমিক মার্চ মাসের বেতন পায়নি। এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখেও শ্রমিকরা মার্চ মাসের বেতন পায়নি, এটা অমানবিক বিষয়। তার দাবি, অন্তত ৫ লাখ শ্রমিকের দায়িত্ব নিতে চায় না বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। এই দুই সংগঠনের নেতারা শ্রমিকদের অস্বীকার করলেও সংগঠন দুটির কারখানার জন্যই মূলত কাজ করেন শ্রমিকরা। সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করা পোশাক কারখানাগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, সাব কন্ট্রাক্টিং ফ্যাক্টরি আছে অনেকগুলো। এগুলো বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর কারখানার হয়ে কাজ করে থাকে। আবার মালিকরাও সুবিধা নেওয়ার জন্য অনেক সময় এই সাব কন্ট্রাট্রিং ফ্যাক্টরিগুলোকেও নিজেদের ফ্যাক্টরি হিসেবে ধরে। কিন্তু যখন দায়িত্ব নেওয়ার বিষয় আসে, তখন তারা বলে এগুলো আমাদের সদস্য নয়।
জানতে চাইল বিকেএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যেসব কারখানা বিজেএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য নয়, তাদেরকে আমরা কিছুই বলতে পারি না। তবে, সেখানকার শ্রমিকরা কোনও সমস্যায় পড়লে বা বেতন না পেলে তার দায় যে কোনওভাবে আমাদের ওপর চাপানো হয়। সে কারণে বলবো, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য ছাড়া কারও এই সেক্টরে ব্যবসা করা উচিত না। তারা যাতে রফতানি করতে না পারে সে ব্যাপারেও নজর দেওয়া দরকার। ’ তিনি জানান, বিকেএমইএ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯০ শতাংশ শ্রমিকের বেতন দিয়েছেন। তবে তার দেওয়া পরিসংখ্যানে এই তথ্যের অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিকেএমইএর ৮৩৩ সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মধ্যে ৫১৩টির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, এর মধ্যে ৪৬৭ কারখানার সব শ্রমিক মার্চ মাসে বেতন পেয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ কারখানার বেতন হয়ে যাবে আশা করা যায়। এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে যারা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য নন, তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন। ফলে কিছু শ্রমিক এখনও বেতন পাচ্ছে না। এইসব মালিক কিভাবে ট্রেড লাইসেন্স পায়, তাদেরকে যারা ট্রেড লাইসেন্স দেন, বা ব্যবসা করার সুযোগ দেন, তাদের বিষয়টি দেখা উচিত।