গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার করাই প্রধান কাজ

আমিরুল আলম খান
করোনা নিয়ে যখন সারা দুনিয়ায় তোলপাড়, সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলা করতে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছিল অন্যরা তখন আমাদের দেশ আনন্দের বন্যায় ভাসছিল। দায়িত্ববানদের মুখে ছিল অহংকারের বুলি, আর মিথ্যাচারের অর্কেস্ট্রা। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাসহ নানা দেশ থেকে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছিল। বিরল নজির হিসেবে চীনা রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে বাংলাদেশে স্থল ও বিমানপথে গমণাগমণ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং, কোয়ারেন্টিন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করা ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। গণমাধ্যম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, নেটিজেনরা অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরা সামগ্রী সরবরাহের দাবি জানাচ্ছিলেন। এ সবের অভাব ও সংগ্রহ বিতরণে সরকারের নির্লিপ্ততার সমালোচনা করে তারা কর্তাদের বিরাগভাজন হয়েছেন। এমন কি সোশ্যাল মিডিয়ায়ও তারা অপ্রত্যাশিত নিন্দার শিকার হয়েছেন। কিন্তু একটি কথা কেউ বিবেবেচনা করেন নি, যে বিনা প্রস্তুতিতে যুদ্ধে যাওয়া যায় না। তাতে লাভ হয় না কিছুই; তি হয় সবটুকুই।
এমন ঘটনা অতীতে বিরল। সরকার জনগণকে আস্থায় না নিয়ে তাদের সাথে বিরূপ ও অনাকাক্সিত আচরণ করেছে। এখনও পর্যন্ত এই অব্যবস্থাপনা সমানে চলছে। এমন কি, জরুরি সেবাদানকারী সংস্থায় কর্মরত কর্মীবাহিনীর জন্যও কোন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন বোধ করে নি। রেইন কোটকে পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) বলে হাসপাতালে সরবরাহ করার অপচেষ্টা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সে চালান গ্রহণে অসম্মতি জানানোর অপরাধে (?) খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে অপদস্থ ও শাস্তি দেয়া হয়েছে। কিন্তু যারা এই দুর্নীতি করেছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা দেশবাসী জানে না। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার নামে যা করা হয়েছে তা অকল্পনীয়। আমরা জানি না, অপরাধীদের বিরুদ্ধে, অযোগ্য লোকদের বিরুদ্ধে আদৌ কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না। ডাক্তার মঈনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতি সিলেট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যে দৈন্য দশা জেনেছে তা অকল্পনীয়।
হাসপাতাল, কিনিক, ফার্মেসি, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরার জন্য কোন নীতিমালা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে কর্তৃপরে উদাসীনতা, ব্যর্থতা সীমাহীন। একেক মন্ত্রীর মুখে জাতি শুধু আস্ফালনপূর্ণ কটুক্তি শুনেছে। অথচ তাদের কারো বিরুদ্ধেই কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় নি।
কোন রকম সমন্বয় ছাড়াই নানা সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। হঠাৎ করেই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তার পরিণাম কী হতে পারে তা ভাবা হয় নি বা কোন নির্দেশনা জারি বা পদপে গ্রহণ করা হয় নি। শুধু ঢাকা থেকেই এক কোটির বেশি মানুষ গ্রামে ছুটে গেছে। আবার গার্মেন্টস মালিকরা খবর পাঠিয়ে তাদের বর্ণনাতীত কেশ সহ্য করে ঢাকা আসতে বাধ্য করেছে। অনেকের বেতন দেয়া হয় নি দু’তিন মাসের। তারা কোথায় থাকবে, কী খাবে তার কোন ব্যবস্থা গার্মেন্টস মালিকপ বা সরকার কেউ করে নি। এসব কা-জ্ঞানহীন কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নিতে পারে নি সরকার।
আমরা প্রায়ই বলে থাকি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ খুবই দ। এ কথা আংশিক সত্য। দৈব-দুর্বিপাকের এ দেশে দুর্যোগ লেগেই থাকে। সেজন্য এখানে একটি বিশাল বাহিনী গড়ে উঠেছে। কিন্তু সে সব দুর্যোগে গোটা দেশ অবরুদ্ধ করার দরকার পড়ে নি। গোটা দেশকে ঘরবন্দি থাকতে হয় নি। মানুষে মানুষে দূরত্ব বজায় রাখতে হয় না। এমন ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভার এদেশে ঘটেছিল প্রায় এক শ’ বছর আগে, ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফøু ছড়িয়েছিল এ দেশে। কিন্তু তখন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়ে ওঠে নি। কলেরা, গুটি বসন্তের সংক্রমণও অনেকটা সীমাবদ্ধ কিছু এলাকায়। গোটা দুনিয়াকে একসাথে তটস্থ করে তোলে নি। কিন্তু গ্লোবাল ভিলেজের এ যুগে সমগ্র বিশ^ই একটা গ্রাম। আর তাই করোনা ছড়াচ্ছে দেশজুড়ে, দুনিয়া জুড়ে একসাথে। ভয়ের কারণ এই গ্লোবালাইজেশন বা বিশ^ায়ন।
বিশ^ায়নের এ যুগে সকল সিদ্ধান নিতে হবে বৈশি^ক পরিস্থিতি মাথায় রেখে। আমরা দেখেছি চীনের পড়শি ছোট ছোট দেশগুলো সাফলে সাথে করোনা মোকাবেলা করে যাচ্ছে। চীনের পরই করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল থাইল্যান্ডে। মারাও গিয়েছিল চীনের পরই সেখানে। ভয় গ্রাস করেছিল। কিন্তু তারা লড়াই করেছে সাহসিকতার সাথে। যত বেশি সম্ভব টেস্ট করেছে। শনাক্ত করেছে, ঘরবন্দি করেছে, চিকিৎসা করেছে। সর্বশেষ খবর বলছে সেখানে এখন পর্যন্ত মারা গেছে মাত্র ৪১ জন, আর আক্রান্ত হয়েছে ২,৬১৩ জন। অথচ থাইল্যান্ডে একটি পর্যটকের ভীড় লেগেই থাকে। পর্যটনের সাথে সেখানকার অর্থনীতি গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেখানে ল ল পরিবারের জীবিকা পর্যটননির্ভর। কিন্তু তারা বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মেনে সফল হয়েছে। ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ যা করেছে তা এই কারোনাকালে অবিশ^াস্য বলেই মনে হবে। কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা করলে যে কঠিন সময়েও অনেক বড় সাফল্য লাভ সম্ভব তারা তা দেখিয়েছে। এসব দেশে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে শক্তিশালী কমিটি করা হয়েছে। সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত স্বাস্থ্য সুরা সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়েছে। আর আমরা ব্যবস্থা করেছি চাল চুরির, রিলিফ চুরির। রিলিফকে প্রণোদনা বলে ঢাক বাজিয়ে চলেছি। অশিতি একদল আমলা-কামলা নিয়ে এমন মহাজাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলার তামাশা দেখাচ্ছি।
এখন গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার করতে হবে। গ্রামে কাজ সৃষ্টি করতে হবে। সঠিক নিরাপত্তা নিশ্চত করে গ্রামীণ জনগণকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। ঠিক এই মুহূর্তে আমাদের রয়েছে প্রায় ৪ কোটি বেকার অথবা লকডাউনের কারণে কর্মহীন যুবক। ধান তোলার এই মুহূর্তে তারাই ত্রাণকর্তা হয়ে উঠতে পারে। মনে রাখতে হবে সবার আগে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। করোনা আক্রান্ত বিশে^ খাদ্য সহায়তা পাওয়া যাবে না কোন দেশ থেকেই। তাই প্রতি কণা ধান মাঠ থেকে ঘরে তুলে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে। সে জন্য কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। দলবাজি ত্যাগ করতে হবে। মাস্তান, রিলিফ চোরদের কঠিনতম শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এসব বিষয়ে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বা অভিজিৎ ব্যাণার্জীর মতামত খুবই সুফল দিতে পারে।
একই সাথে আমরা পৃথিবীর সফল অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগাতে পারি। মিডিয়ার উচিত সে কাহিনী সংগ্রহ করে ব্যাপক প্রচার করা যাতে আমাদের জনগণ উদ্বুদ্ধ হতে পারে। পশ্চিমা মিডিয়া শুধু আতংক ছড়াচ্ছে। তাদের অন্য অ্যাজেন্ডা আছে। সে ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। তাই পশ্চিমা মিডিয়া নির্ভরতা কমাতে হবে। তার সাথে নিজস্ব প্রয়োজন এবং বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল বিচেনায় নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করে, ঐক্যবদ্ধভাবে এই নজিরবিহীন সংকট মোকাবেলা করতে পারি।
আমিরুল আলম খান, যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান
ভাগ