করোনা: ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণার দাবি বামজোটের সর্বদলীয় সভায়

লোকসমাজ ডেস্ক॥ করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় ‘সমন্বিত উদ্যোগ’ এবং ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর সেগুন বাগিচার রিপোর্টার্স ইউনিটি কার্যালয় ভবনের পঞ্চম তলায় অনুষ্ঠিত জোটের উদ্যোগে ‘সর্বদলীয় পরামর্শ সভা’ থেকে এই দাবি উত্থাপিত হয়। পাশাপাশি বামদের এই দাবির প্রতি অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলও সমর্থন জানিয়েছে।
সর্বদলীয় এই পরামর্শক সভায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ছাড়া বিএনপি, সিপিবি, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বামজোটসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা স্কাইপের মাধ্যমে এই পরামর্শ সভায় অংশগ্রহণ করেন। এদের মধ্যে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাসদের খালেকুজ্জামান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের প্রধান টিপু বিশ্বাস প্রমুখ নেতা বক্তব্য রাখেন। সভার সূচনা বক্তব্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ করোনাভাইরাস সংক্রমণকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে তা মোকাবিলায় ‘সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ’ গ্রহণের দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই সব রাজনৈতিক দল, ছাত্র-যুবকসহ সামাজিক শক্তি, সাংস্কৃতিক সংগঠন, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞদের ঐক্যবদ্ধ করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বলে আসছি। সবার আকাঙ্ক্ষার অংশ হিসেবেই সমন্বিত উদ্যোগের লক্ষ্যে আজকের এই সভা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা আজকে এখানে আমাদের সঙ্গে স্কাইপে যুক্ত হয়েছেন। তারা ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখবেন বলে আশা রাখি।’ গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আপনাদের বক্তব্য আমি সমর্থন করি। জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আমাদের এই করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলা করতে হবে। এককভাবে এটা সম্ভব না। সম্মিলিতভাবে করতে হলে মতবিনিময় করা, ঐকমত্য গঠন করা এবং সারা জাতিকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে কোনও সংকীর্ণ চিন্তা না করে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করতে হবে। যারা ঝুঁকির মধ্যে আছেন তাদের প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দিতে হবে। সবাইকে নিয়ে এটা করা সম্ভব। এককভাবে কোনও দল বা কোনও সংগঠন পারবে না। আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে সব শক্তি নিয়ে কাজ করতে হবে।’
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ থেকে সচেতনভাবে কাজ করছি। ভেতরের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার সেগুলোকে কখনও গুরুত্ব দেয়নি। আজকে যে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে, এটা একেবারেই খুবই অপ্রতুল। আমরা জেনেছি যে, ৪০ হাজার লোকের মধ্যে মাত্র ৩০০ লোকের মধ্যে দেন এবং সেটাও দলীয়করণ করা হয়েছে পুরোপুরিভাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো থেকে ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলে এই করোনাভাইরাস মোকাবিলা কোনোভাবে সম্ভব না। সবচেয়ে ভয়াবহ দিন আসছে সামনের দিনগুলোতে। আপনারা সবাই একমত হবেন, আমরা সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশপ্রেমকে সামনে রেখে, সততাকে সামনে রেখে যদি হ্যান্ডেল করা না যায়, তাহলে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বো, অনেকে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও করছেন।’ ফখরুল বলেন, ‘জাতীয় ও বৈশ্বিক মহাদুর্যোগ মোকাবিলায় যেকোনও উদ্যোগে শামিল হতে আমরা প্রস্তুত আছি। এই দুর্যোগ পরিস্থিতিতে দম্ভ, অহঙ্কার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরিহার করে এই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে অবশ্যই সরকারকেই। কারণ, পুরো দায়িত্বটা সরকারের। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের অনেক অবহেলা এবং আমি জানি না, তারা এটাকে নেগলেট করেছেন কী কারণে, যার ফলে অনেক বড় সমস্যায় পড়েছি।’ ফখরুল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমন্বিত পরিকল্পনা করে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর রহমতে এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো।’ করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি দলীয় পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে ৮৭ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্রদানের প্রস্তাবনাগুলো তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব। দলের প্রস্তাবনার একটি কপিও চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খানের মাধ্যমে বামজোটের কাছে হস্তান্তর করেন তিনি। জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জাতীয় দুর্যোগ কমিটি গঠন করতে হবে। সবাইকে নিয়ে, সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে, ১৬ কোটি মানুষকে নিয়ে, সব সামাজিক শক্তিসহ সব পেশার মানুষকে নিয়ে এই কমিটি করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি না।’ রব বলেন, ‘একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করতে হবে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে না পারলে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি আরও সৃষ্টি হবে। আমি অনুরোধ করবো, সরকারসহ সব মহলকে আসুন, আমরা জাতিগতভাবে একত্রিত হই এবং জাতীয় এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করি। আমি মনে করি, এখনও সময় আছে সবাইকে একত্রিত করার।’
সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘এই মহাদুর্যোগ একার পক্ষে নয়, ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দরকার। এটা করতে হবে। আমি এখনও আহ্বান জানাবো, সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করার। সরকারি যন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় যন্ত্রসহ সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার। একাত্তরে আমরা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, করোনাভাইরাসের এই ক্রান্তিকাল মোকাবিলায়ও আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ সভায় গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘২০১২ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী এবং ২০১৮-এর জনস্বাস্থ্য বিষয়ক পরিস্থিতিতে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে। চিকিৎসা, সব শ্রমজীবী ও শ্রমিকের জন্য খাদ্য ও নগদ অর্থ প্রদান করতে হবে। আসন্ন দুর্ভিক্ষ বা খাদ্য সংকট মোকাবিলার জন্য কৃষি খাতে সরাসরি ভর্তুকি দিয়ে আশু দুর্যোগকালীন বাজেট ঘোষণা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এছাড়া চাল চুরি, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে নিষ্ঠুর খেলা, মানুষের অমর্যাদা বন্ধ করতে হবে।’ অবাধ তথ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানান জোনায়েদ সাকি। বামজোটের সর্বদলীয় সভায় স্কাইপিতে আরও যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন গণফোরামের অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম, বাম ঐক্যজোটের আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন আহমেদ নাসু, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মোশরেফা মিশু, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক, ওয়ার্কার্স পার্টির (মাকর্সবাদী) সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ সবুর। সভা সঞ্চালনা করেছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বাসদ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ, তার সঙ্গে ছিলেন সিপিবি নেতা কাফি রতন, রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদ নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা আকবর খান প্রমুখ।

ভাগ