ত্রাণ লুটে জড়িতদের বিরুদ্ধে ৩ দফা শাস্তির পথে আ.লীগ

লোকসমাজ ডেস্ক॥ দরিদ্রদের জন্য সরকারের বরাদ্দ দেওয়া ত্রাণ লুট করছেন কিছু জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। যেসব নেতাকর্মী ত্রাণ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হবে। ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না তারা। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কয়েক দিন ধরে সরকার এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ত্রাণ নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, অন্যদিকে ত্রাণ লুণ্ঠনের অভিযোগ উঠেছে দলটির মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বিব্রত দলটির হাইকমান্ড এবার লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন বলেছেন, ‘ত্রাণ লুণ্ঠনকারীদের বিষয়ে দলের কঠোর অবস্থান আগে থেকেই আছে। অভিযুক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এর মধ্যে অনেকে আছেন, যারা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে, তাদেরকে প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে কাজ করছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় ইউনিটগুলো। আর দলীয় পরিচয় থাকলে তাদেরকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে করোনাভাইরাসের এই সংকটকালে হাজার হাজার নেতাকর্মী দিনরাত পরিশ্রম করে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষের ঘরে ঘরে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতারা এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি কিছু লোকের জন্য পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। কেউ যদি ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতির আশ্রয় নেন, আমরা তাদেরকে কঠোরভাবে দমন করছি।’
ত্রাণ লুটের ঘটনায় একের পর আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের নাম আসায় তাদের কঠোর হাতে দমন করতে এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। চলছে কঠোর নজরদারিও। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও।
ত্রাণ লুটেরাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘করোনার সময়ে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতি করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বরখাস্ত ও ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।’ ত্রাণ চুরি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না, জানিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘স্পষ্টভাবে একটা কথা বলতে চাই, ত্রাণ বিতরণে কোনোরূপ অনিয়ম সহ্য করা হবে না। খেটে খাওয়া মানুষের ত্রাণ নিয়ে যারাই ছিনিমিনি খেলবে, তারা যেই হোক, তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’ বিভিন্ন সূত্র ও গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, বরগুনা, বগুড়া, নাটোর, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিকরগাছা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, সিলেট, নওগাঁ, শেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নেত্রকোনা, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহসহ বেশকিছু জেলায় ত্রাণ চুরির অভিযোগ উঠেছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের অনেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ত্রাণ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর রানীনগর এলাকায় আয়াত আলী, কালিগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, নাটোরের সিংড়া উপজেলার শাহিন শাহ, সেখানকার একটি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়ন আবু সাঈদ সাইদুর, সেখানকার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ওয়াজেদ হোসেন, বোরহানউদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন হায়দার, নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে আমিনুর রহমান শাকিল, পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরে আবুল কালাম, কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। ত্রাণ লুটের অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছেন অনেকে। আওয়ামী লীগের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ত্রাণ লুটের ঘটনাগুলো তৃণমূলের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও বিষয়টি আওয়ামী লীগের জন্য বিব্রতকর। এজন্য ত্রাণ আত্মসাতের এসব ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে ওইসব নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে এবং তাদের আইনের হাতে তুলে দিতে দলের স্থানীয় ইউনিটগুলো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্ন্ত অসহায় মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনোভাবেই ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম তিনি সহ্য করবেন না।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ‘কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে, যেগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছি। কারণ, আপনারা জানেন, এরইমধ্যে সরকার এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কীভাবে মানুষের দোরগোড়ায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে কাজ করছে। এরপরও ত্রাণ আত্মসাতের এসব ঘটনাকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’ তিনি বলেন, ‘এরইমধ্যেযাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের দলীয় পরিচয় থাকলে সাংগঠনিকভাবে বহিষ্কার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নিতেও প্রশাসনকে সহযোগিতা করছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে, ত্রাণ যাতে অসহায় মানুষের ঘরে ঘরে যায়। আমরা সেটিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।’ সরকারি ত্রাণ যারা আত্ত্মসাৎ করছে তাদের ‘মানুষরূপী জানোয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ করছি, এই দুর্যোগময় সময়ে অসহায় মানুষদের জন্য দেয়া ত্রাণ নিয়ে কিছু আত্মসাতের অভিযোগ উঠছে। আমি অবাক হয়ে যাই, কারা এসব মানুষ, যারা এই দুর্যোগের সময়ের অসহায় মানুষের ত্রাণ আত্মসাৎ করার চিন্তা করে। এদেরকে মানুষ বলা যায় না, মানুষরূপী জানোয়ার। এদের প্রতি আমি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করি, নিন্দা জানাই।’ ত্রাণ আত্মসাৎকারীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান মাহবুব উল আলম হানিফ।

ভাগ