আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ ॥ বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে সোলা পল্লীর কারিগররা সকল প্রস্তুতি শেষ করেছিলেন। ঘরে সাজিয়ে রেখেছেন সোলার তৈরি থোকা থোকা ফুল, কিন্তু বিক্রি নেই। এছাড়া বিয়ে বাড়িতেও এই ফুলসোলা ব্যবহার হতো। মহাজনেরা বলেই দিয়েছেন আপাতত মাল পাঠাবেন না। এই অবস্থায় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের নরদিহী গ্রামে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র এই শিল্পের প্রতিবন্ধী ও নারী শ্রমিকরা তাদের পারিশ্রমিক (বেতন) পাচ্ছেন না।
স্থানীয় ভাবে এই শিল্পটির বর্তমান পরিচালক তোফায়েল হোসেন জানান, দেশের এই পরিস্থিতিতে সবকিছু যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে, তেমনি তার শিল্পটিও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে। বৈশাখ উপলক্ষে তৈরি করা মালামাল বাড়িতেই পড়ে আছে। মহাজনেরা নতুন করে মাল নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, এমনকী বকেয়া টাকাও দিচ্ছেন না। এই অবস্থায় কি করবেন, আর কীভাবে অসহায় প্রতিবন্ধী ও নারীদের পারিশ্রমিক দেবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
তোফায়েল হোসেন আরও জানান, ২০০৪ সালে তার ভগ্নিপতি প্রতিবন্ধী সিরাজুল ইসলাম এই সোলার কারখানা গড়ে তোলেন। নাম দেন রিগ্যাল হ্যান্ডিক্রাফ্টস অ্যন্ড ড্রাই ফাওয়ার। সিরাজুল ইসলামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ গ্রামে। তিনি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নরদিহী গ্রামে এই কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কয়েক বছর তাদের কারখানায় শতাধিক শ্রমিক ফুল তৈরির কাজ করতেন। যাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ জন প্রতিবন্ধী । সিরাজুল ইসলাম প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের জন্য বাড়িতে এই কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে কারখানায় ৩০ জন কাজ করেন। যারা সোলা দিয়ে ফুল তৈরি ও ফুলের মালা গাঁথার কাজ করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে সোলা সংগ্রহ করে সেটাকে কেটে ফুল তৈরির উপযোগী করেন। এরপর মালা তৈরি করা হয়। অনেকে কারখানায় আবার অনেকে তাদের এখান থেকে সোলা নিয়ে বাড়িতে বসেই ফুল তৈরি করছেন। তিনি জানান, প্রায় ৪০ প্রকারের ফুল ও ফুলের মালা তারা এই সোলা দিয়ে তৈরি করে থাকেন। গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতেও এই সোলা ফুলের কদর বেশি।
ফুল তৈরির েেত্র প্রথমে সোলা কেটে কাগজ তৈরি করে সেটাকে রোল বানানো হয়। তারপর বেলি, জিনিয়া, গোলাপ, ছোট গোলাপ, গোলাপকুড়ি, গন্ধরাজ, রজনীকুড়ি, জিরোফুলসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল তৈরি করেন। এগুলোর সারা বছর চাহিদা থাকলেও পহেলা বৈশাখে চাহিদা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। যে কারনে তারা এই সময় অতিরিক্ত পরিশ্রম করে ফুল তৈরি করেন। ঘরে মজুদ করেন নানা ধরনের ফুল। যা দিয়ে সাজবে বাংলার তরুণ-তরুণীরা, বরণ করবে বাংলা নববর্ষকে। নববর্ষের মুহূর্তে বেলি, জুই, জিনিয়া, পদ্ম, গন্ধরাজ ফুলের চাহিদার যেন শেষ থাকে না। তোফায়েল হোসেন জানান, এবারও বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে তারা অতিরিক্ত ফুল তৈরি করেছেন। ইতঃপূর্বে বছরের অন্য সময়ে মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। কিন্তু দেশে চায়না ফুলের আগমন ঘটায় তা কমে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। কিন্তু নববর্ষের সময় বিক্রি হয় লক্ষাধিক টাকার ফুল। এবারও তারা লক্ষাধিক টাকার ফুল মজুদ করেছেন। কিন্তু কোনো বিক্রি নেই। তোফায়েল হোসেন জানান, আন্তজার্তিক প্রতিবন্ধী দিবসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত মেলায় তাদের এই সোলা শিল্প নিয়ে বেশ কয়েকবার স্টল দিয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু সরকারি কোনো সহযোগিতা আজো পাননি। অর্থের অভাবে কারখানাও বড় করতে পারছেন না। সহজ শর্তে ঋণ পেলে কারখানা আরও বড় করে অনেকের কর্মসংস্থান করতে পারবেন বলে আশা করেন তিনি।





